ঢাকা শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬

menu

দাম কমেছে-বাড়ছে, তবু পাঁচ বছরে প্রায় দ্বিগুণ এলপিজির বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২৬, ০৯:৫২ এএম

দাম কমেছে-বাড়ছে, তবু পাঁচ বছরে প্রায় দ্বিগুণ এলপিজির বাজার

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের দাম গত পাঁচ বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিভিন্ন সময়ে দাম বাড়ানো ও কমানোর পরও ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ৯৭৫ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ পাঁচ বছরে নির্ধারিত দাম বেড়েছে ৯৬৫ টাকা বা প্রায় ৯৯ শতাংশ।

যদিও পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা দাম কমানোর কারণে বর্তমানে ১২ কেজি এলপিজির নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু বিইআরসির নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাস্তব বাজারদরের বড় ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসে বিইআরসি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করলেও বিভিন্ন এলাকায় তা ২ হাজার ১৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ফলে একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বিইআরসির মাসভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, অন্যদিকে নির্ধারিত দামে পণ্য না পাওয়ার অভিযোগ—দুইয়ের চাপে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।

২০২১ সালে ৯৭৫ টাকা থেকে শুরু

দেশে বেসরকারি পর্যায়ের এলপিজির দাম প্রথমবারের মতো ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল নির্ধারণ করে বিইআরসি। সে সময় ১২ কেজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৯৭৫ টাকা।

এরপর বিশ্ববাজারে এলপিজির মূল্য, আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতি মাসে দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

২০২১ সালের এপ্রিলের ৯৭৫ টাকা থেকে মে মাসে দাম কমে ৯০৬ টাকা এবং জুনে আরও কমে ৮৪২ টাকা হয়। এরপর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ দফায় দাম বাড়ে। নভেম্বরে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৩১৩ টাকা। পরে ডিসেম্বরে ৮৫ টাকা কমিয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ২২৮ টাকা।

২০২২ সালে বাড়ল সাত দফা, কমল পাঁচ দফা

২০২২ সালেও এলপিজির দামে ছিল ওঠানামা। ওই বছর সাত দফায় দাম বাড়ানোর বিপরীতে পাঁচ দফা দাম কমানো হয়। বছর শেষে ডিসেম্বরে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ২৯৭ টাকা। এর আগে বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে দাম ছিল ১ হাজার ১৭৪ টাকা।

অর্থাৎ দাম কমানোর কয়েকটি সিদ্ধান্ত এলেও বছর শেষে আগের বছরের তুলনায় বেশি দামেই বছর শেষ হয়।

২০২৩ সালে সর্বনিম্ন ৯৯৯ টাকা

২০২৩ সালেও সাত দফায় দাম বাড়ানো হয়। এর বিপরীতে পাঁচ দফায় দাম কমানো হয়েছিল। বছরের শুরুতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ২৩২ টাকা। জুনে তা কমে বছরের সর্বনিম্ন ৯৯৯ টাকায় নেমে আসে।

তবে পরবর্তী সময়ে আবার দাম বাড়তে থাকে। ডিসেম্বর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৪০৪ টাকা।

২০২৪ সালে দাম বাড়ানোর প্রবণতা

২০২৪ সালেও এলপিজির দাম কয়েক দফায় বাড়ানো হয়। বছরের শুরুতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৪৩৩ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ১ হাজার ৪৭৪ টাকা এবং মার্চে ১ হাজার ৪৮২ টাকা।

এরপর বিভিন্ন মাসে দাম কমা-বাড়ার মধ্য দিয়ে বছরের শেষ দিকে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৪৫৫ টাকা।

২০২৫ সালে কমেছিল এলপিজির দাম

২০২৫ সালে আগের কয়েক বছরের তুলনায় দাম বাড়ানোর প্রবণতা কম ছিল। বছরজুড়ে দুই দফায় দাম বাড়ানোর বিপরীতে একাধিক দফায় দাম কমানো হয়।

ফলে নভেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম নেমে আসে ১ হাজার ২১৫ টাকায়। তবে বছরের সর্বোচ্চ দাম ছিল ফেব্রুয়ারি মাসে—১ হাজার ৪৭৮ টাকা।

২০২৬ সালের এপ্রিলে এক মাসেই বড় ধাক্কা

চলতি ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে এলপিজির বাজারে আবার বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। জানুয়ারিতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৫৬ টাকা করা হয়।

পরে ভ্যাট কমানোর কারণে ১৫ টাকা কমিয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৩৪১ টাকা। মার্চে দাম অপরিবর্তিত ছিল।

কিন্তু এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা দাম বাড়ানো হয়। প্রথম দফায় ৩৮৭ টাকা এবং দ্বিতীয় দফায় ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজি এলপিজির নির্ধারিত দাম করা হয় ১ হাজার ৯৪০ টাকা।

এটি ২০২১ সালের এপ্রিলের ৯৭৫ টাকার তুলনায় ৯৬৫ টাকা বেশি। শতাংশের হিসাবে বৃদ্ধি প্রায় ৯৯ শতাংশ।

পরে আবার কমতে থাকে দাম

এপ্রিলের রেকর্ড বৃদ্ধির পর অবশ্য জুন ও জুলাইয়ে দাম কমে আসে। জুনে ৫৫ টাকা এবং জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়। এরপর আগস্টে এক দফায় ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৫৯৮ টাকা।

সর্বশেষ সেপ্টেম্বরে আরও ১৩ টাকা কমিয়ে ১২ কেজি এলপিজির নির্ধারিত দাম করা হয় ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

অর্থাৎ এপ্রিলের ১ হাজার ৯৪০ টাকা থেকে সেপ্টেম্বরের ১ হাজার ৫৮৫ টাকায় নামলেও ২০২১ সালের এপ্রিলের ৯৭৫ টাকার তুলনায় বর্তমান নির্ধারিত দাম এখনও ৬১০ টাকা বেশি।

বিইআরসির দামে বাজারে এলপিজি মিলছে না কেন?

দাম মাসে মাসে সমন্বয় করা হলেও বাস্তবে বিইআরসির নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় ২ হাজার ১৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

অর্থাৎ নির্ধারিত দামের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোক্তাকে প্রায় ৫৬৫ থেকে ৯১৫ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে।

খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি অংশ বাজারে সরবরাহ সংকটের কথা বলছেন। তবে এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটরদের পক্ষ থেকে দেশে এলপিজির সংকট নেই বলে দাবি করা হয়েছে।

দেশে এলপিজির সংকট নেই: আমদানিকারকরা

গত ২৮ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে বৈঠক করেন দেশের এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা। বৈঠকে দেশের এলপিজি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।

এনবিআর সূত্রে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে বৈঠকে জানানো হয়, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে আরও ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন।

আমদানির এ পরিমাণ এবং দেশে মজুত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররা বৈঠকে জানান, দেশে বর্তমানে এলপিজির কোনো ধরনের সংকট নেই।

কৃত্রিম সংকট হলে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ

এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কোথাও বেশি দামে বিক্রি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ৩০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নির্দেশ দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী।

সচিবালয়ে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে অনলাইন বৈঠকে মন্ত্রী বলেন, দেশে এলপিজির সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। তবে কোনো কোনো এলাকায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হতে পারে।

সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও কোথাও কেন সংকটের কথা শোনা যাচ্ছে এবং কেন অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখে তথ্য ও প্রমাণসহ প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য ডিসিদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

পর্যাপ্ত সরবরাহের দাবি লোয়াবের

এর পরদিন ১ অক্টোবর দেশে এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক রয়েছে বলে জানায় এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)।

সংগঠনটি জানায়, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি বা অবৈধভাবে মজুত করা হলে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

ফলে সরবরাহে ঘাটতি নেই—আমদানিকারক ও অপারেটরদের এমন দাবির পরও বাজারে কেন নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে, সেটিই এখন ভোক্তাদের বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞের প্রশ্ন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা কোথায়?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলমের মতে, এলপিজির দাম যেভাবে বাড়ানো হচ্ছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের জন্য তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিইআরসির নির্ধারিত দামে অনেক জায়গায় বাজারে এলপিজি বিক্রি হয় না। ফলে গ্রাহকদের অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এলপিজি খাতে অনিয়ম প্রতিরোধে বিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। তাঁর মতে, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপও বিবেচনা করা উচিত।

সামনে বড় প্রশ্ন—নির্ধারিত দামে এলপিজি পাবেন ভোক্তা?

এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার দাবি, আমদানির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ, সরকারের নজরদারি জোরদারের নির্দেশ এবং ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতার পর এখন মূল প্রশ্ন—ভোক্তারা শেষ পর্যন্ত বিইআরসির নির্ধারিত দামে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারবেন কি না।

কারণ কাগজে-কলমে দাম নির্ধারণ হলেও বাজারে যদি তার চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হয়, তাহলে মাসিক মূল্য সমন্বয়ের সুফল সাধারণ ভোক্তার কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে—সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। একই সঙ্গে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার পরও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগের পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তা খুঁজে বের করা এবং কার্যকর বাজার তদারকি নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!