শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর পূর্ব রামপুরার জামতলা ও খিলগাঁওয়ের তালতলা এলাকায় রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার খুঁজতে গিয়ে ভোগান্তির মুখে পড়েন আহমেদ শিপন। বউবাজার, নতুনবাগসহ আশপাশের বিভিন্ন দোকানে প্রায় এক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পরও সিলিন্ডার পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত পরিচিত একজনের সূত্র ধরে একটি বড় দোকান থেকে সিলিন্ডার পেলেও দাম দিতে হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকা।
অথচ ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ, একটি সিলিন্ডার কিনতে তাঁকে নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত ৪৬৩ টাকা দিতে হয়েছে।
আহমেদ শিপন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকায় বসবাস শুরু করার পর থেকে কখনো সরকারি নির্ধারিত দামে গ্যাস কিনতে পারেননি। কোথায় নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায়, সেটিও তাঁর জানা নেই। প্রতি মাসে গ্যাসের দাম পুনর্নির্ধারণের খবর শুনলেও বাস্তবে সেই দামে সিলিন্ডার কেনার অভিজ্ঞতা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, গত রাত থেকে বাসায় গ্যাস না থাকায় রান্না বন্ধ ছিল। ছুটির দিনের সকালটাও সিলিন্ডার খুঁজতে চলে গেছে। আশপাশের দোকানগুলোতে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত একটি বড় দোকানে যান। সেখানেও প্রথমে সিলিন্ডার নেই বলে জানানো হয়। পরে পরিচিত একজনের সূত্রে একই দোকান থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় সিলিন্ডার পান। কোথাও কোথাও ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও শুনেছেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, বেসরকারি কোম্পানির গ্যাস টাকা দিয়েও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না; সিলিন্ডার পেতে পরিচিতজনের সূত্র প্রয়োজন হচ্ছে। একজন নাগরিকের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি হতাশাজনক।
২৫২ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় নতুন দাম
গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। এর আগে এই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
তবে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি বলে অভিযোগ করছেন ভোক্তারা। নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়া, দোকানে দোকানে ঘুরেও খালি হাতে ফেরা এবং বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে ক্ষোভ বাড়ছে।
ভোক্তাদের জন্য নির্ধারিত মূল্য কার্যকর না হলে দাম পুনর্নির্ধারণের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। বিশেষ করে যেসব পরিবার রান্নার জন্য সম্পূর্ণভাবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য সরবরাহ সংকট ও বাড়তি দাম সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম, দাবি পরিবেশকদের
এলপিজি পরিবেশকদের দাবি, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কয়েকটি কোম্পানি বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। মেঘনা ফ্রেশ, ওমেরা, আইগ্যাস, যমুনা, পেট্রোম্যাক্স ও বিএমসহ কয়েকটি কোম্পানি বাজারে এলপিজি সরবরাহ করছে। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে বলে দাবি তাঁদের।
পরিবেশকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো কোম্পানি সীমিত পরিমাণে সিলিন্ডার সরবরাহ করছে। আবার কিছু কোম্পানির সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে খুচরা বাজারে সব ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার সমানভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিভেদে ১২ কেজি সিলিন্ডারের মূল্যতালিকায় ১ হাজার ৭৪০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত পার্থক্য রয়েছে। এই মূল্যতালিকার ব্যবধানও বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
তবে সরবরাহ কম থাকার কারণ, কোন কোম্পানি কী পরিমাণ সিলিন্ডার বাজারে ছাড়ছে এবং কোথায় কত দামে বিক্রি হচ্ছে—এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করে দেখা প্রয়োজন। সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে কোনো বিক্রেতা অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা জরুরি।
কমিশন বাড়ানোর দাবি পরিবেশকদের
নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করতে গিয়ে লোকসান হচ্ছে দাবি করে পরিবেশকদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি। এ বিষয়ে গত ৬ অক্টোবর বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছে সংগঠনটি।
চিঠিতে পরিবহন, সিলিন্ডার ওঠানো-নামানো, গোডাউন পরিচালনা, কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, লাইসেন্স ফি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
সমিতির হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গোডাউনে সিলিন্ডার আনতে ব্যয় হয় ৫০ টাকা। ট্রাকে ওঠানো-নামানো এবং খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে খরচ হয় আরও ৩৫ টাকা। এ ছাড়া কর্মচারী, গোডাউন ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, লাইসেন্স ফি ও অন্যান্য খাতে ব্যয় হয় ২৫ টাকা।
এর সঙ্গে প্রতি সিলিন্ডারে ৪০ টাকা মুনাফা ধরলে পরিবেশক পর্যায়ে মোট ১৫০ টাকা প্রয়োজন বলে দাবি সংগঠনটির। অথচ পাঁচ বছর ধরে কমিশন হিসেবে দেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। ফলে প্রতি সিলিন্ডারে ১০০ টাকা ঘাটতি থাকছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কমিশন অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে বর্তমান কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিইআরসি বলছে, গণশুনানি ছাড়া ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ নেই
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
তিনি জানিয়েছেন, গণশুনানি ছাড়া এসব ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ নেই। ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে রোববার কমিশন সভায় আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। নতুন সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
অর্থাৎ, পরিবেশকদের কমিশন বাড়ানোর দাবি থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কমিশন কার্যকর হওয়ার কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। এ বিষয়ে কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ
বাজারে সিলিন্ডারের সংকটের পাশাপাশি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আহমেদ শিপনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারিত দামের সিলিন্ডার কিনতে তাঁকে দিতে হয়েছে ২ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ, বাড়তি দিতে হয়েছে ৪৬৩ টাকা।
ব্যবসায়ীরা পরিচালন ব্যয় ও কমিশনের ঘাটতির কথা বললেও, এ কারণে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার বৈধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় না। মূল্য সমন্বয়ের দাবি থাকলে তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে।
এদিকে সরবরাহ সংকটের সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো বিক্রেতা অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোম্পানি থেকে পরিবেশক এবং পরিবেশক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা শনাক্ত করা জরুরি।
পাঁচ বছর ধরে একই কমিশন, বাড়ছে ব্যয়
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে বিইআরসি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে। সে সময় পরিবেশকদের কমিশন সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরিবেশকদের দাবি, এরপর পাঁচ বছর ধরে কমিশনের অঙ্ক অপরিবর্তিত থাকলেও পরিবহন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কমিশন পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে কমিশন বাড়ানো হলে তার প্রভাব ভোক্তার ওপর পড়বে কি না, নির্ধারিত দাম কীভাবে বাস্তবসম্মত রাখা যাবে এবং সরবরাহব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ব্যবসায়ীদের প্রকৃত ব্যয় যাচাই করে মূল্য ও কমিশনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা।
সংকট নিরসনে নজরদারি ও সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি
এলপিজির বর্তমান পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রথমত, কোম্পানিগুলোর সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ যাচাই করে বাজারে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার পৌঁছানো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত দামে বিক্রি হচ্ছে কি না, তা খুচরা পর্যায়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার। তৃতীয়ত, পরিবেশকদের কমিশন ও পরিচালন ব্যয়ের দাবি যাচাই করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কোম্পানিভেদে মূল্যতালিকার পার্থক্য এবং বাজারে সিলিন্ডারের প্রকৃত প্রাপ্যতা সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা হলে ভোক্তারা উপকৃত হতে পারেন।
রান্নার গ্যাস এখন বহু পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। তাই শুধু দাম নির্ধারণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেই দামে বাজারে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

