সরকার জনগণের রান্নাঘর পর্যন্ত ভোগান্তি পৌঁছে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। ২৯ দিনের ব্যবধানে দুই দফা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ানোর প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেছেন, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার করা না হলে খালি গ্যাস সিলিন্ডার, হাঁড়ি-পাতিল ও কলস নিয়ে রাজপথে নামা ছাড়া জনগণের সামনে আর কোনো উপায় থাকবে না।
সোমবার (২ নভেম্বর) রাতে রাজধানীর রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারের সামনে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এলপিজির ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে দলটি।
সংবাদ সম্মেলনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সরকার জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে থাকা জনগণের জন্য রান্নার জ্বালানির বাড়তি দাম নতুন সংকট তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, `সরকার যেহেতু আমাদের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, আমাদের এখন খালি সিলিন্ডার নিয়ে রাজপথে নামা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। পাড়া-মহল্লার মা-বোনদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা খালি গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে প্রতিবাদ শুরু করুন।`
মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
এলপিজির দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছিল এবং গণশুনানির মাধ্যমে গ্যাসের দাম নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসরণ না করে কয়েকটি কোম্পানির মালিকের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তব কর্মকাণ্ডের কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। গণশুনানি ও কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে দাম নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকলেও তা কার্যকর করা হচ্ছে না। বরং কয়েকটি কোম্পানির মালিকের কথামতো জনগণের স্বার্থ উপেক্ষা করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা উচিত। জনগণের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনা করে সরকারকে অবিলম্বে এই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে।
১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা
এলপিজির বাড়তি দামকে সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের আর্থিক চাপ হিসেবে উল্লেখ করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে ২ হাজার ৬০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে গ্যাসের দাম বেশি বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, গৃহস্থালি কাজে এলপিজি এখন অনেক পরিবারের জন্য অপরিহার্য জ্বালানি। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের সুবিধা নেই, সেসব পরিবারের রান্নাবান্না সম্পূর্ণভাবে সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দাম বাড়লে সরাসরি এর প্রভাব পড়ে পারিবারিক বাজেটে।
এনসিপির এই নেতা বলেন, গ্যাসের সিলিন্ডার এখন সাধারণ মানুষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি তাঁরা প্রত্যাশা করেননি। সরকার যদি মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করে, তাহলে খালি সিলিন্ডারের পাশাপাশি হাঁড়ি-পাতিল ও কলস নিয়ে জনগণকে রাজপথে নেমে অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে হবে।
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে গোয়েন্দা ব্যর্থতার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন নিয়েও কথা বলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। শ্রমিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি এটিকে গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, কোনো আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন থাকলে তা আগেভাগে শনাক্ত করা গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব। সরকার যদি দাবি করে শ্রমিক আন্দোলনে আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগে থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আরও বলেন, সরকার ব্যর্থ হলে আওয়ামী লীগ সেই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। দলটি ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করতে পারে। এ কারণে শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকাগুলো নিরাপদ রাখতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি শ্রমিক অঞ্চলগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ হিসেবে উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানায় এনসিপি। দলটির নেতাদের মতে, জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে কোম্পানির স্বার্থের পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
এলপিজির দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর রান্নার খরচ আরও বাড়বে। এতে সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে। তাই সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

