এসএসসি পরীক্ষায় যেসব শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হবে, তাদের ঝরে পড়া রোধে ফল প্রকাশের মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, বছরের পর বছর ফেল করার এই প্রথা চলতে পারে না। শিক্ষার্থীদের অযথা সময় নষ্ট করে একটি বছর পার করার সুযোগ আর দিতে চায় না সরকার।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুপুরে বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় অবস্থিত পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) মিলনায়তনে ৪৯তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ৬৫ জন কর্মকর্তার ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্যে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমানো এবং শিক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘ বিরতি এড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরীক্ষার সময়সূচি, প্রস্তুতির সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলোর কার্যক্রম কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দুই বিষয়ে ফেল করলেও দ্রুত পরীক্ষার সুযোগ
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসএসসি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে আবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, সামান্য কয়েকটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে যেন কোনো শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময়ের জন্য শিক্ষাজীবন থেকে পিছিয়ে না পড়ে।
সাধারণত পাবলিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের পরবর্তী পরীক্ষার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এতে অনেকের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘ বিরতি তৈরি হয়। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিরতি ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
দ্রুত পুনঃপরীক্ষার সুযোগ চালু করা গেলে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক কম সময়ের মধ্যে নিজেদের ঘাটতি পূরণ করে আবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। এর ফলে তাদের শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হতে পারে।
তবে ঘোষিত উদ্যোগের বাস্তবায়নপদ্ধতি, পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এবং এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়মকানুন সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের বিস্তারিত নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
বারবার ফেল নয়, শিক্ষার্থীদের সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় সরকার
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর অকৃতকার্য হয়ে সময় নষ্ট করার বিষয়টি কোনোভাবেই চলতে পারে না। শিক্ষাজীবনে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ বিরতি তৈরি না করে শিক্ষার্থীদের দ্রুত পরবর্তী ধাপে এগিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে চায় সরকার।
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় পাস করানো নয়; বরং শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা। সে বিবেচনায় কোনো শিক্ষার্থী এক বা দুটি বিষয়ে দুর্বলতার কারণে যেন দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে তাদের দুর্বলতা চিহ্নিত করা, অতিরিক্ত পাঠদানের সুযোগ তৈরি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা-সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পরীক্ষার আয়োজন নয়, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
সাধারণ শিক্ষায় পিছিয়ে পড়লে কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, যেসব শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষার ধারায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে না, তাদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে পরিচালিত করা হবে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, সব শিক্ষার্থীর মেধা, আগ্রহ ও দক্ষতা এক রকম নয়। কেউ সাধারণ শিক্ষায় ভালো করতে পারে, আবার কেউ হাতে-কলমে কাজ শেখা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ কিংবা পেশাভিত্তিক শিক্ষায় বেশি দক্ষতা অর্জন করতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত শিক্ষার পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ ধরনের শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পেশায় প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
তবে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা, দক্ষ প্রশিক্ষক, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ এবং প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে তাদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষাপথ নির্ধারণ করতে হবে।
নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয় রোধে সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলায় গুরুত্ব
দেশে নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয় রোধে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, নৈতিকতার অবক্ষয় থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার জোর তৎপরতা শুরু করেছে।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় চতুর্থ শ্রেণি থেকেই বিদ্যালয়গুলোতে সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা ও নৈতিক শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের নৈতিক, সামাজিক ও মানসিক বিকাশের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পুরো প্রজন্মকে নৈতিক ও সামাজিকভাবে উন্নত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং ‘প্রধানমন্ত্রী গোল্ডকাপ’ চালু করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, নৈতিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলা শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ, দায়িত্বশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বিদ্যালয় পর্যায়ে এসব কার্যক্রম নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হলে শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ততাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি পরিবার ও সামাজিক পরিবেশেরও ভূমিকা রয়েছে।
৬৫ কর্মকর্তার ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যারা
বগুড়ার শেরপুরে পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ৪৯তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ৬৫ জন কর্মকর্তার ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের (মাউশি) ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. সরদার কেরামত আলী।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক আব্দুল মজিদ এবং শিক্ষামন্ত্রীর সহধর্মিণী নাজমুন নাহার বেবী।
অনুষ্ঠানে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি এবং শিক্ষা প্রশাসনের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা খান একাডেমি আয়োজিত ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
বাস্তবায়নের অপেক্ষায় শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন উদ্যোগ
এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘ বিরতি কমানোর একটি নতুন পথ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় যুক্ত করা এবং বিদ্যালয়ে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বহুমুখী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার ওপর। দ্রুত পুনঃপরীক্ষার সুযোগের পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমানো এবং ভবিষ্যতের জন্য যোগ্য মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জনে ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে।

