ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

menu

বিদ্যুৎ উৎপাদনের দোরগোড়ায় রূপপুর, বি-টু অনুমতির অপেক্ষায় প্রথম ইউনিট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম

বিদ্যুৎ উৎপাদনের দোরগোড়ায় রূপপুর, বি-টু অনুমতির অপেক্ষায় প্রথম ইউনিট

ছবিঃ সংগৃহীত

বিদ্যুৎ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের দ্বারপ্রান্তে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর। প্রকল্পটির প্রথম ইউনিট এখন ‘বি-টু’ বা ক্রিটিক্যালিটিতে যাওয়ার অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়ার পরই এই ধাপে প্রবেশ করবে রূপপুরের প্রথম ইউনিট।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বি-টু ধাপটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরও কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। এর আগে সম্পন্ন করা বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা।

কী হবে ‘ক্রিটিক্যালিটি’ পর্যায়ে?

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিভাজনের মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন করা হয়। সেই তাপ ব্যবহার করে বাষ্প তৈরি এবং টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

‘ক্রিটিক্যালিটি’ হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়, যখন চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হয়। অর্থাৎ একটি পরমাণুর বিভাজন থেকে উৎপন্ন নিউট্রন পরবর্তী পরমাণুর বিভাজন ঘটায় এবং এভাবে একটি নিয়ন্ত্রিত ধারাবাহিক পারমাণবিক বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে ক্রিটিক্যালিটিতে পৌঁছানো মানেই সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়া নয়। এর পরও বিভিন্ন ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়ানো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই এবং নির্ধারিত পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়।

বায়রার অনুমতি মিললেই বি-টু

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন জানিয়েছেন, বি-টু ধাপে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বায়রার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়ার পর পরবর্তী ধাপে যাওয়া হবে। প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে এবং এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমতির অপেক্ষা রয়েছে।

প্রকল্প পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সবকিছু বায়রার কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনুমতি পাওয়ার পরই প্রথম ইউনিটকে বি-টু পর্যায়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

আগের ধাপের পরীক্ষা সফল

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে বি-টু ধাপে যাওয়ার আগে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশনা ও নিরাপত্তা কাঠামো অনুসরণ করেই এসব পরীক্ষা পরিচালিত হচ্ছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সর্বশেষ স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভের পরীক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ওই পরীক্ষাকে ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতাও কাটিয়ে ওঠা হয়েছে।

এর ফলে প্রথম ইউনিটকে পরবর্তী পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে বড় একটি বাধা দূর হয়েছে বলে মনে করছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

বি-টু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে

রূপপুরের প্রথম ইউনিট বি-টু পর্যায়ে যাওয়ার পর চুল্লির প্রাথমিক অপারেশন ও নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়ার প্রস্তুতি শুরু হবে। এরপর ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়ানো হবে।

চুল্লির ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানোর সময় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে এগিয়ে প্রথম ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ৩০০ মেগাওয়াট পর্যায়ে পৌঁছালে বাণিজ্যিকভাবে জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

কবে আসবে রূপপুরের বিদ্যুৎ?

দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধি, উৎপাদন ঘাটতি এবং বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ আসবে—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ রয়েছে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ধাপে ধাপে এগোতে হয়। তাই ক্রিটিক্যালিটি শুরু হওয়ার পরও নির্ধারিত পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং ক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করতে হবে।

ফলে বায়রার অনুমতি পাওয়ার পর বি-টু ও ক্রিটিক্যালিটি পর্যায়ে প্রবেশ করলেও সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে না। নির্ধারিত কারিগরি ও নিরাপত্তা ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই জাতীয় সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহের দিকে যাবে প্রথম ইউনিট।

রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মাণ

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পটিতে দুটি ইউনিট রয়েছে।

প্রতিটি ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে গেলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় নিরবচ্ছিন্ন ও তুলনামূলক স্থিতিশীল বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহে রূপপুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন নয়, বরং প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চুল্লিতে চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করার আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা যাচাইয়ের বিষয়টি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রূপপুরের প্রথম ইউনিট বি-টু পর্যায়ে যাওয়ার আগে বায়রার অনুমতি পাওয়ার বিষয়টি সেই নিরাপত্তা কাঠামোরই অংশ। অনুমতি পাওয়ার পর নিয়ন্ত্রিতভাবে পরবর্তী ধাপে এগোবে প্রকল্পটি।

সব পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাই সফলভাবে সম্পন্ন করে প্রথম ইউনিট বাণিজ্যিক উৎপাদনে গেলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে এটি হবে একটি বড় মাইলফলক।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!