রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে কমিশনিং কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ইউনিটটির বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিমূলক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘স্টেজ-সি’ বা ‘পাওয়ার স্টার্টআপে’ প্রবেশ করবে ইউনিটটি।
স্টেজ-সি পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে এসব ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়, স্থিতিশীল পরিচালনা এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রস্তুতি যাচাই করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এ পর্যায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটকে পরবর্তী কমিশনিং ধাপে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে স্টেজ-সি শুরু হওয়া, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু—এগুলো পৃথক ধাপ। প্রতিটি পর্যায় সম্পন্ন করতে নির্ধারিত কারিগরি পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণ করতে হবে।
স্টেজ-সি পর্যায়ে কী কী পরীক্ষা হবে?
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, স্টেজ-সি পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর, প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যবস্থা, টারবাইন-জেনারেটর, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, যন্ত্রপাতি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।
এ পর্যায়ে শুধু পৃথক যন্ত্রপাতি ঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাই করাই লক্ষ্য নয়; বরং পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যবস্থা একসঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হবে। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রিঅ্যাক্টরের তাপশক্তি থেকে বাষ্প তৈরি, সেই বাষ্পের সাহায্যে টারবাইন ঘোরানো এবং জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন—প্রতিটি ধাপের মধ্যে সঠিক সমন্বয় থাকা জরুরি।
স্টেজ-সি পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পরিচালনগত পরামিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। তাপমাত্রা, চাপ, প্রবাহ, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সাড়া এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী যাচাই করা হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপে এগোনোর উপযোগিতা নির্ধারণ করা হবে।
টারবাইন-জেনারেটর ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই
বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টরে উৎপন্ন তাপ ব্যবহার করে বাষ্পের মাধ্যমে টারবাইন ঘোরানো হয়। টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর যান্ত্রিক শক্তিকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তর করে। তাই রিঅ্যাক্টর পরিচালনার পাশাপাশি টারবাইন, জেনারেটর এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করাও স্টেজ-সি পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
ড. জাহেদুল হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, এ পর্যায়ে টারবাইনের নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা, জেনারেটর এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাগুলো স্বাভাবিক পরিচালন পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে।
বিশেষ করে বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং নির্ধারিত পরিচালন সীমার মধ্যে যন্ত্রপাতির আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা যথাযথভাবে সাড়া দিচ্ছে কি না, সেটিও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এসব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কার্যক্রম পরবর্তী কমিশনিং ধাপে এগিয়ে নেওয়ার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রমে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো জেনারেটরকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সফলভাবে যুক্ত করা। তবে গ্রিডে সংযোগ স্থাপন শুধু একটি সুইচ চালু করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ভোল্টেজ, ফ্রিকোয়েন্সি, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং গ্রিডের পরিচালনগত শর্তের সমন্বয় জড়িত।
স্টেজ-সি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়ের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালনার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হবে। গ্রিডের সঙ্গে সংযোগের পর নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে তা দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। তবে গ্রিডে প্রথমবার বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়া এবং পূর্ণ সক্ষমতায় নিয়মিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এক বিষয় নয়। উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট কারিগরি ও নিরাপত্তাগত শর্ত পূরণ করতে হয়।
পারমাণবিক নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণে কমিশনিংয়ের প্রতিটি ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন।
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন বায়েরা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়েছে। এসব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিলে পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া এগোবে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফিজিক্স টেস্টের মূল উদ্দেশ্য হলো রিঅ্যাক্টরের নিউক্লিয়ার বৈশিষ্ট্য ও আচরণ নির্ধারিত নকশা এবং নিরাপত্তাগত শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা। পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণের মাধ্যমে রিঅ্যাক্টর পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
তবে কোনো একটি ধাপের পরীক্ষা সফল হওয়া মানেই পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব পরীক্ষা সম্পন্ন হয়ে গেছে—এমন নয়। কমিশনিংয়ের পরবর্তী পর্যায়েও ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা যাচাই করতে হয়। প্রতিটি পর্যায়ের ফলাফল সন্তোষজনক হওয়া এবং প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করা পরবর্তী ধাপে যাওয়ার পূর্বশর্ত।
স্টেজ-সি, পাইলট অপারেশন ও বাণিজ্যিক উৎপাদনের পার্থক্য
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের অগ্রগতি বুঝতে স্টেজ-সি, পরীক্ষামূলক পরিচালনা এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনের পার্থক্য জানা জরুরি।
স্টেজ-সি বা পাওয়ার স্টার্টআপ: এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। নিরাপদ পরিচালনা এবং বিভিন্ন ব্যবস্থার সমন্বয় যাচাই করা এ পর্যায়ের অন্যতম উদ্দেশ্য।
পাইলট অপারেশন বা পরীক্ষামূলক পরিচালনা: প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও কমিশনিংয়ের শর্ত পূরণের পর প্রযোজ্য অনুমোদন সাপেক্ষে বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পরীক্ষামূলক পরিচালনার পর্যায়ে নেওয়া হতে পারে। এ সময় কেন্দ্রটির পরিচালনগত স্থিতিশীলতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং নির্ধারিত শর্তে কাজ করার সক্ষমতা যাচাই করা হয়।
বাণিজ্যিক উৎপাদন: প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, কমিশনিং, নিরাপত্তা যাচাই এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণের পর বাণিজ্যিক উৎপাদনের অনুমোদন ও কার্যক্রম শুরু হয়। এ পর্যায়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের দিকে অগ্রসর হয়।
অতএব, স্টেজ-সি পর্যায়ে প্রবেশ করলেই বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। প্রতিটি ধাপের জন্য পৃথক কারিগরি যাচাই এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ।
রূপপুর প্রকল্পের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই অগ্রগতি?
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম বড় অবকাঠামো প্রকল্প। এর প্রথম ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রম সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে প্রকল্পটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি আরও এক ধাপ এগোবে।
তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রকৃত অবদান নির্ভর করবে নিরাপদ পরিচালনা, নির্ভরযোগ্য উৎপাদন, জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় এবং নির্ধারিত সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। এ কারণে দ্রুত উৎপাদন শুরু করার পাশাপাশি কারিগরি মান ও পারমাণবিক নিরাপত্তার শর্ত পূরণ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটের বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে এবং পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন বায়েরা কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা ও অনুমোদনের ভিত্তিতে স্টেজ-সি পর্যায়ে যাওয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বি-২ ধাপের পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়া কমিশনিং কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর বিষয়ে নিশ্চিত হতে পরবর্তী পরীক্ষার ফলাফল, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করতে হবে।

