চট্টগ্রামের পটিয়ায় যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যে তানিয়া কামাল নিহাত (২০) নামে নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। রোববার (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের চরকানাই মোনাফ হাজির পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী নুর উদ্দিনকে (২৫) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ।
নিহত তানিয়া পটিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হরিণখাইন গ্রামের মোহাম্মদ কামালের মেয়ে। তাঁর স্বামী নুর উদ্দিন একই উপজেলার হাবিলাসদ্বীপ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মোনাফ হাজির পাড়ার কাঞ্চন মিয়ার ছেলে।
প্রেমের সম্পর্কের পর বিয়ে, পরে পারিবারিক কলহ
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তানিয়া ও নুর উদ্দিনের মধ্যে প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর প্রথম দিকে তাঁদের সংসার স্বাভাবিকভাবে চললেও কিছুদিনের মধ্যে পারিবারিক কলহ শুরু হয়।
নিহত গৃহবধূর পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তানিয়ার সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে তাঁকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের।
তবে তানিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী, তা ময়নাতদন্ত ও পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ঈদে উপহার দেওয়ার পরও নতুন করে যৌতুক দাবির অভিযোগ
তানিয়ার বাবা মোহাম্মদ কামালের অভিযোগ, গত ঈদে শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁর মেয়ের জন্য নতুন কাপড়চোপড় ও উপহার দাবি করেছিলেন। পরে রমজান মাসে নিজের আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে উপহার দেন। কিন্তু সম্প্রতি আবারও কাপড়চোপড় ও যৌতুক দাবি করা হয়।
মোহাম্মদ কামালের ভাষ্য অনুযায়ী, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নতুন করে করা দাবিগুলো পূরণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে বিরোধের জেরে তানিয়ার ওপর নির্যাতন শুরু হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তানিয়ার পরিবারের দাবি, বিষয়টি নিয়ে এলাকায় কয়েক দফা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সালিশ-বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু এসব বৈঠকের পরও পারিবারিক বিরোধের স্থায়ী সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা তানিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি
পটিয়া উপজেলা কৃষকদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন বলেন, তানিয়া ও নুর উদ্দিনের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ককে সম্মান জানিয়ে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিয়ের পর যৌতুকের কারণে এভাবে একটি প্রাণ ঝরে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
স্বামী পুলিশ হেফাজতে, ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে মরদেহ
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক বলেন, গৃহবধূর স্বামী নুর উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত কিছু জানালে মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
তদন্তের অপেক্ষায় পরিবার ও স্থানীয়রা
নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক তরুণ গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে চলমান পারিবারিক বিরোধের পরিণতিতেই এই মৃত্যু ঘটেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনই এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

