ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

menu

জেএমবিএফের তথ্য: চলতি বছর মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের শিকার ১০৯ শিশু বাড়ছে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১১:১৫ এএম

জেএমবিএফের তথ্য: চলতি বছর মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের শিকার ১০৯ শিশু বাড়ছে উদ্বেগ

ছবিঃ সংগৃহীত

শিক্ষা, নৈতিকতা ও নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার প্রত্যাশা নিয়ে সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠান অভিভাবকেরা। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেই যদি শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কতটা—এ প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ছেলে শিশুদের ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা, অভিযোগের তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা।

মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের (জেএমবিএফ) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলে শিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ১৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর সংখ্যা ১৭১। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৬১ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১০ শিশু। সংস্থাটির তথ্য বলছে, মাদ্রাসায় সংঘটিত ৭২টি ঘটনায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১০৯ শিশু।

এই পরিসংখ্যান শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তদারকি এবং অভিযোগের কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অপরাধের পর মামলা করা বা শাস্তির বিধান থাকলেই চলবে না; নির্যাতন প্রতিরোধ, দ্রুত প্রমাণ সংগ্রহ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং শিশুবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়াও নিশ্চিত করতে হবে।

বনশ্রীর মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর মৃত্যু, বিচার নিয়ে প্রশ্ন

চলতি বছরের মে মাসে রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় একটি মাদ্রাসার ভেতর থেকে ১০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আবদুল্লাহর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় যৌন নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে তার মা মামলা করেন। মামলার পর একই মাদ্রাসার এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি শিশুর এমন পরিণতি কীভাবে হলো এবং এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন—তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে মামলার বর্তমান অবস্থা, তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি এবং বিচার বিলম্বের নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নির্যাতনের অভিযোগে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে ভুক্তভোগী পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। একই সঙ্গে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়ে।

নয় মাসে ১৭১ ছেলে শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার

জেএমবিএফের পর্যবেক্ষণে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলে শিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ১৩১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ১৭১ শিশু ভুক্তভোগী হয়েছে।

সংস্থাটির হিসাবে, ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৬১ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১০ শিশু। এর মধ্যে মাদ্রাসায় সংঘটিত ৭২টি ঘটনায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১০৯ শিশু।

তবে এ পরিসংখ্যানকে দেশের সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণে নথিভুক্ত ঘটনার বাইরে আরও ঘটনা থাকতে পারে, বিশেষ করে সামাজিক লজ্জা, ভয়, হুমকি কিংবা পারিবারিক চাপের কারণে যেসব ঘটনায় অভিযোগ করা হয় না।

ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনা অনেক সময় প্রকাশ্যে আসে না। নির্যাতনের শিকার শিশুর পরিবার সামাজিক অপমানের আশঙ্কায় অভিযোগ জানাতে দ্বিধা করতে পারে। আবার শিশু নিজেও ভয়, অপরাধবোধ কিংবা নির্যাতনকারীর চাপের কারণে ঘটনা প্রকাশ করতে পারে না। ফলে প্রকৃত চিত্র নিরূপণ ও অপরাধীদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রমাণ সংগ্রহে জটিলতা, সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার প্রয়োজন

শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে চিকিৎসা পরীক্ষা, ডিএনএ পরীক্ষা এবং অন্যান্য ফরেনসিক প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা, নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং পরীক্ষার ফলাফল নথিভুক্ত করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান।

তিনি বলেন, মেডিকেল টেস্ট ও ডিএনএ টেস্টসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে এসব কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে আলাদা ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা এখনো দেখতে পান না তিনি। এতে প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌন নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা ও ফরেনসিক পরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং মানসিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংবেদনশীল ও শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে পরীক্ষা পরিচালনা করতে হবে।

প্রমাণ সংগ্রহে বিলম্ব, নমুনা যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা কিংবা পরীক্ষার ফলাফল নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে ত্রুটি তদন্তকে জটিল করে তুলতে পারে। তাই চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তদন্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে—সব শিশুর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক ও শিশুবান্ধব পদ্ধতি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ এবং সুস্পষ্ট কার্যপদ্ধতি প্রণয়নও গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু শাস্তি নয়, প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি

শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন মানবাধিকারকর্মীরা।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম বলেন, শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। শিক্ষক ও সাধারণ মানুষকেও এ বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে, যাতে শিশুরা কোনো ভয় ছাড়াই নিজেদের সমস্যা ও অভিজ্ঞতার কথা জানাতে পারে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তারা নির্যাতন বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের শিকার হলে নির্ভয়ে বিশ্বস্ত কারও কাছে অভিযোগ জানাতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের বয়স উপযোগী ভাষায় ব্যক্তিগত সীমানা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এবং বিপদের পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা শেখানো দরকার। পাশাপাশি শিশু কোনো অভিযোগ জানালে তাকে দোষারোপ না করে মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং দ্রুত যথাযথ সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু অভিভাবক বা শিক্ষকদের একার নয়। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার সুস্পষ্ট নীতিমালা, অভিযোগ জানানোর গোপনীয় ও নিরাপদ ব্যবস্থা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন, নিয়মিত তদারকি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর পদ্ধতি থাকা জরুরি।

অভিযোগ উঠলে তা ধামাচাপা না দিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া, শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং ভুক্তভোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশু নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তের সময় এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যাতে ভুক্তভোগী শিশু আবারও মানসিক আঘাতের শিকার হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ, চিকিৎসা পরীক্ষা ও আইনি প্রক্রিয়ায় শিশুর মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি।

বিচার বিলম্ব কমানো ও ভুক্তভোগীর সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন

যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের জন্য অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং আইনি সহযোগিতা প্রয়োজন। নির্যাতনের অভিজ্ঞতা শিশুর শিক্ষা, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত তদন্ত শুরু, প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং আইন অনুযায়ী বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকা দরকার।

শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর শুধু সাময়িক আলোচনা বা প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি, জনসচেতনতা এবং অপরাধের কার্যকর বিচার—এই চারটি ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

নিরাপদ শৈশল নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য

মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের নিয়ে জেএমবিএফের পরিসংখ্যান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে। তবে নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা দিয়ে সমস্যার পুরো ব্যাপ্তি বোঝা সম্ভব নয়। যেসব ঘটনা ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকায় প্রকাশ্যে আসে না, সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

অভিভাবকেরা সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠান নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা ও বিকাশের প্রত্যাশায়। সেই আস্থা রক্ষা করতে হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

শিশুদের যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দিতে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ সংগ্রহ, দ্রুত বিচার এবং ভুক্তভোগীর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তারা ভয় বা লজ্জা ছাড়াই নির্যাতনের কথা জানাতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!