ঢাকা রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

menu

পাঁচবিবিতে সড়কের কার্পেটিং নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, ১০ দিনেই উঠে যাচ্ছে পিচ

মোঃ বাবুল হোসেন, জয়পুরহাট জেলা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম

পাঁচবিবিতে সড়কের কার্পেটিং নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ, ১০ দিনেই উঠে যাচ্ছে পিচ

ছবিঃ সংগৃহীত

জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার আটাপুর ইউনিয়নের গলাকাটা-আংড়া সড়কের কার্পেটিং কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কাজ শেষ হওয়ার মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সড়কের পিচ হাত দিয়ে টানলে উঠে আসছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের দাবি, শুরু থেকেই সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের বিষয়ে আপত্তি জানানো হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ কার্পেটিংয়ের পর পিচ উঠে যাওয়ায় সড়কটির নির্মাণকাজের গুণগত মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইট ও খোয়া ব্যবহারের পর এবার কার্পেটিংয়ের কাজে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার এবং নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁরা প্রতিবাদ জানাতে গেলে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন। তবে ঠিকাদার এসব অভিযোগের মধ্যে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে পিচ জমতে কিছুটা সময় লাগছে।

৮৫ লাখ টাকার প্রকল্পের সড়ক নিয়ে প্রশ্ন

উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বৃহত্তর পাবনা-বগুড়া জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পাঁচবিবি উপজেলার গলাকাটা-আংড়া সড়কের ৯৮০ মিটার অংশ নির্মাণের জন্য প্রায় ৮৫ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। কাজটির কার্যাদেশ পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স লিনা এন্টারপ্রাইজ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কাজ শুরুর পর থেকেই সড়কে ব্যবহৃত ইট ও খোয়ার মান নিয়ে আপত্তি ওঠে। এ নিয়ে এলাকাবাসী প্রতিবাদ জানালে তাঁদের বাধার মুখে কিছু খোয়া পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু এরপরও নির্মাণকাজের মান নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ কাটেনি। সর্বশেষ কার্পেটিংয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই পিচ উঠে যেতে শুরু করায় তাঁদের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি সড়কের পিচ এত অল্প সময়ের মধ্যে উঠে গেলে এর স্থায়িত্ব কত দিন থাকবে? নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিটুমিনের মান, পরিমাণ এবং কার্পেটিংয়ের পদ্ধতি যথাযথ ছিল কি না, তা পরীক্ষা করে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

‘৮ থেকে ১০ দিনেই উঠে যাচ্ছে পিচ’

আটাপুর ইউনিয়নের দাউদপুর গ্রামের বাসিন্দা মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, সড়কটির কাজের শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তাঁরা অভিযোগ করে আসছেন। কিন্তু তাঁদের আপত্তি যথাযথভাবে আমলে নেওয়া হয়নি বলে তাঁর দাবি।

তিনি বলেন, ‘৮ থেকে ১০ দিন আগে রাস্তায় পিচ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনই হাত দিয়ে টানলে পিচ উঠে যাচ্ছে। শুরু থেকেই নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার নিয়ে আমরা প্রতিবাদ করেছি। আমাদের কথায় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।’

মোয়াজ্জেম হোসেন আরও অভিযোগ করেন, অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাঁদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, ঠিকাদার ভাড়াটে লোক এনে তাঁদের ভয়ভীতি দেখিয়েছেন। এ অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করেও সমস্যার সমাধান পাচ্ছেন না বলে তিনি দাবি করেন।

‘১৫ দিন, পরে ২৮ দিন অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে’

একই গ্রামের বাসিন্দা হারুনুর রশিদ বলেন, সড়কে কার্পেটিংয়ের সময় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়ে তাঁরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। তখন তাঁদের বলা হয়েছিল, পিচ শক্ত হতে ১৫ দিন সময় লাগবে। কিন্তু ওই সময় পার হওয়ার পরও বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে যেতে দেখা যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

হারুনুর রশিদ বলেন, পিচ উঠে যাওয়া জায়গাগুলোতে আবার নতুন করে পিচ দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এখন ২৮ দিন সময় লাগবে বলে জানানো হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, চোখের সামনে নির্মাণকাজে অনিয়ম হচ্ছে বলে মনে হলেও প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তাঁরা হুমকির মুখে পড়ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শুধু পিচ উঠে যাওয়া স্থানে নতুন করে কার্পেটিং করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বরং সড়ক নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণের মান, বিটুমিনের পরিমাণ, কার্পেটিংয়ের পুরুত্ব এবং কাজের অন্যান্য কারিগরি বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তবে এসব বিষয়ে কোনো কারিগরি তদন্তের ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি।

তাপমাত্রাকে দায়ী করছেন ঠিকাদার

সড়কটির নির্মাণকাজের বিষয়ে ঠিকাদার মাহাবুব হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে পিচ জমতে কিছুটা সময় লাগছে। কিছুদিন পর সড়কের অবস্থা ঠিক হয়ে যাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

স্থানীয়দের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার বলেন, তিনি কয়েকজন ঠিকাদারকে সঙ্গে নিয়ে সড়কটি দেখতে গিয়েছিলেন।

তবে সড়কের পিচ উঠে যাওয়ার কারণ নির্ধারণে কোনো কারিগরি পরীক্ষা হয়েছে কি না, কিংবা নির্মাণকাজে ব্যবহৃত উপকরণের মান যাচাই করা হয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রকৌশলীর

এ বিষয়ে পাঁচবিবি উপজেলা প্রকৌশলী মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সড়কের কার্পেটিং উঠে যাওয়ার বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারসহ যৌথভাবে সড়কটি পরিদর্শন করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তাঁর এ বক্তব্যের পর স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন, নির্মাণকাজের গুণগত মান যাচাই এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়ক নির্মাণে অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে। সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোর কাজের মান নিশ্চিত করা এবং নির্মাণের পরপরই ত্রুটি দেখা দিলে তা যথাযথভাবে নিরসন করা জরুরি।

তাঁদের দাবি, গলাকাটা-আংড়া সড়কের কার্পেটিংয়ের গুণগত মান দ্রুত পরীক্ষা করতে হবে। পাশাপাশি বিটুমিনের মান ও পরিমাণ, কার্পেটিংয়ের পুরুত্ব এবং প্রকল্পের নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন ও তদন্তে সড়কটির পিচ উঠে যাওয়ার প্রকৃত কারণ কীভাবে নির্ধারিত হয়, সেটিই দেখার বিষয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে একদিকে যেমন সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দারাও একটি টেকসই সড়ক ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!