চট্টগ্রামের পটিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগের ৯ দিন পর মারা গেছেন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ সিফাতুন নূর। গুরুতর আহত অবস্থায় গত ১৪ অক্টোবর তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বাবার বাড়ি থেকে নাশতা কম দেওয়ার বিষয় নিয়ে বিরোধের জেরে সিফাতুন ও তাঁর মায়ের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তা মারধরে গড়ায়। তবে কীভাবে সিফাতুন গুরুতর আহত হয়েছিলেন, তা এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
এ ঘটনায় নিহতের বাবার করা মামলার পর তাঁর শাশুড়ি রিজিয়া বেগমকে আটক করেছে পুলিশ। মারধরের অভিযোগে অভিযুক্ত অন্য ব্যক্তিরা পলাতক রয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
চার মাস আগে বিয়ে, তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন সিফাতুন
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিফাতুন নূরের বাড়ি চট্টগ্রামের চন্দনাইশ পৌরসভা এলাকায়। প্রায় চার মাস আগে পটিয়া উপজেলার পূর্ব কুসুমপুরা গ্রামের দুবাইপ্রবাসী তারেকের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়।
নিহতের স্বজনদের দাবি, বিয়ের পর থেকেই যৌতুক ও বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাবিতে সিফাতুনকে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো। ঘটনার সময় তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে গৃহস্থালির জিনিসপত্র দাবি করা হতো। তাঁদের ভাষ্য, এসব চাহিদা পূরণ করার পরও নতুন নতুন জিনিস চাওয়া হতো।
নিহতের এক স্বজন বলেন, ‘দুইটা কলসি দিছি, কয় আরেকটা কলসি। ফার্নিচার দিছি, কয় আরেকটা আলমারি দিতে কয়। এই ধরনের চাওয়ার কোনো শেষ নাই। ৪০০ নাশতা নিয়াও তাদের মন ভরে নাই।’
তবে যৌতুক দাবি ও নির্যাতনের এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
নাশতা কম দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের অভিযোগ
নিহতের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর রাতে সিফাতুনের জন্য নাশতা নিয়ে তাঁর মা শ্বশুরবাড়িতে যান। নাশতা কম আনা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে সিফাতুনের শাশুড়ি তাঁর মায়ের সঙ্গে তর্কে জড়ান বলে দাবি স্বজনদের।
একপর্যায়ে সিফাতুন ও তাঁর মায়ের সঙ্গে শাশুড়ির ধস্তাধস্তি হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সিফাতুন মারধরের শিকার হন বলে দাবি পরিবারের।
স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার রাতে ফোনে কথোপকথনের মাধ্যমে পরিকল্পনা করে সিফাতুনকে নির্যাতন করা হয়েছিল। তবে এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশও এখন পর্যন্ত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ করেনি।
সিসিটিভি ফুটেজে ধস্তাধস্তির দৃশ্য
পরিবারের দাবি, ঘটনার দিন ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে সিফাতুন, তাঁর মা ও শাশুড়ির মধ্যে ধস্তাধস্তির দৃশ্য বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়। ফুটেজে ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি দেখা যায় বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ফুটেজে ধস্তাধস্তির দৃশ্যের কিছুক্ষণ পর সিফাতুনের মা মেয়েকে মেরে ফেলা হয়েছে—এমন বিলাপ করছিলেন বলেও শোনা যায়।
তবে সিসিটিভি ফুটেজের পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু, ঘটনার আগে ও পরের দৃশ্য এবং সিফাতুনের আঘাতের সঙ্গে এর সম্পর্ক সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ফুটেজ পেয়েছে এবং ঘটনার অন্যান্য দিকও খতিয়ে দেখছে।
গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে, ৯ দিন পর মৃত্যু
পরিবারের দাবি, ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সিফাতুনকে বাড়ি থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।
সেখানে টানা নয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবরে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে।
তবে সিফাতুনের শরীরে কী ধরনের আঘাত ছিল, আঘাতের প্রকৃতি কী এবং সেগুলোর সঙ্গে মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর চিকিৎসকের প্রতিবেদন ও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আত্মহত্যার দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিবার
সিফাতুনের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামীর পক্ষ থেকে আত্মহত্যার দাবি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিহতের স্বজনেরা। তবে এই দাবির সঙ্গে একমত নন তাঁরা। পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ, সিফাতুনকে নির্যাতন করা হয়েছিল এবং পরে ঘটনাটিকে অন্যভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
নিহতের এক স্বজন বলেন, ‘মেয়ের জামাই বলতেছে, উনি নিজে নিজে সুইসাইড করছে। মেয়ে যদি নিজে নিজে সুইসাইড করতো, তাহলে এতগুলা করার দরকার নাই, উনি ফাঁসিতে ঝুলে মরে যাইতো। উনি ১০ দিন কীভাবে বেঁচে থাকল আইসিইউতে? উনাকে ঝুলানো হয়েছে, এটা একটা নাটক সাজানো হচ্ছে।’
এটি নিহতের পরিবারের একজন স্বজনের বক্তব্য ও সন্দেহ। আত্মহত্যার দাবি কিংবা নির্যাতনের অভিযোগ—কোনোটিই তদন্তের ফল, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ ছাড়া চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সিফাতুন কীভাবে আহত হয়েছিলেন, তাঁর আঘাতের ধরন কী ছিল এবং ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।
পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক টেলিফোনে বলেন, তাঁদের মধ্যে পারিবারিক মনোমালিন্য ছিল। একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, আগে বা পরে আঘাত করা হয়েছিল কি না, তা চিকিৎসকের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বলা যাবে। আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের প্রতিবেদন ঘটনার প্রকৃতি ও আঘাতের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে ঘটনার ধারাবাহিকতা নির্ধারণ করতে হবে।
নিহতের বাবার করা মামলায় শাশুড়ি রিজিয়া বেগমকে আটক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অন্য অভিযুক্তদের অবস্থান এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
একজন অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা নির্যাতন, যৌতুক দাবি ও আত্মহত্যার পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের কারণে ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি অভিযুক্তদের বক্তব্য, চিকিৎসকের প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা জরুরি।
সিফাতুনের মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। অন্যদিকে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা সিফাতুন নূরের মৃত্যু শুধু তাঁর পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি পারিবারিক নির্যাতন ও যৌতুকসংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপের গুরুত্বও সামনে এনেছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন এবং দায় নির্ধারণের অপেক্ষায় রয়েছেন নিহতের স্বজনেরা।

