ঢাকা রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

menu

পাহাড়ে অস্ত্রের মহড়া, অবরোধে স্থবির সাজেকের পর্যটন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১০:৪৭ এএম

পাহাড়ে অস্ত্রের মহড়া, অবরোধে স্থবির সাজেকের পর্যটন

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে টানা তিন দিন ধরে বিরাজ করছে অচলাবস্থা। ইউপিডিএফ সমর্থিত ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের পাঁচ দফা দাবিতে আধাবেলা অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। অবরোধের কারণে দুই জেলায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে, বন্ধ ছিল দূরপাল্লার যান চলাচল। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা। একই সঙ্গে পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

অবরোধ চলাকালে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় সড়কে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে একদল ব্যক্তিকে মহড়া দিতে দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, অস্ত্রধারীরা সবাই ইউপিডিএফের সদস্য। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে গাছ ফেলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালানো হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় এসব চেষ্টা সফল হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে সাজেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের প্রভাবে পর্যটনকেন্দ্রটির কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালানোর চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পাঁচ দফা দাবিতে আধাবেলা অবরোধ

ইউপিডিএফ সমর্থিত ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ পাঁচ দফা দাবিতে আধাবেলা অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। সংগঠনটির দাবি, লাঠিপেটা, গুলিবর্ষণ, দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার প্রতিবাদে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা বলেন, এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানাতেই আধাবেলা অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় সড়কে পিকেটিং করেন আন্দোলনকারীরা। কয়েকটি স্থানে গাছ ফেলে যান চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় এসব বাধা সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়।

তবে এই কর্মসূচির বিরোধিতা করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, এ কর্মসূচির কোনো ভিত্তি নেই। এটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক।

দুই পক্ষের বিপরীতমুখী বক্তব্যে পার্বত্য এলাকার চলমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

মাটিরাঙায় অস্ত্রধারীদের মহড়া, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

অবরোধ চলাকালে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় সড়কে অস্ত্র হাতে একদল ব্যক্তির মহড়ার দৃশ্য সামনে আসায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, ওই ব্যক্তিরা ইউপিডিএফের সদস্য। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া সাত থেকে আটটি স্থানে সড়কে গাছ ফেলে যান চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কায় কিসলু বলেন, এখন পর্যন্ত সদর এলাকায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। সেখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশের টহল অব্যাহত আছে।

যান চলাচল বন্ধ, ভোগান্তিতে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা

অবরোধের কারণে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি থেকে দূরপাল্লার কোনো গাড়ি ছেড়ে যায়নি। সড়কে যান চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষকে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকেরাও পড়েছেন বিপাকে।

বিশেষ করে সাজেকে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক না থাকায় পর্যটনকেন্দ্রটিতে যাতায়াত ও অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এর আগে সাজেকে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে উদ্ধারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

পর্যটনকেন্দ্রটিতে চলাচল সীমিত হওয়ায় আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন এবং স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ সময় এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে পর্যটননির্ভর জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

সংকট নিরসনে আলোচনার উদ্যোগ

সাজেকের চলমান অচলাবস্থা নিরসনে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালানোর চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, দাবি-দাওয়া ও বিরোধের সমাধানে আলোচনা জরুরি; একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রটির কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

খাগড়াছড়ির ব্যবসায়ী নেতা জাহেদুল আলম বলেন, আলোচনা চলতে পারে, তবে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। অবরোধের কারণে সাজেকের পর্যটন ব্যবসা যেন বন্ধ হয়ে না যায়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।

ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য উজ্জল দেবও সংকট সমাধানে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রস্তাব গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সঠিক ও যৌক্তিক আলোচনায় অংশ নেবেন।

স্বাভাবিক পর্যটন কার্যক্রম ফেরার অপেক্ষা

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত সাজেক দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। সেখানকার পর্যটন কার্যক্রমের সঙ্গে স্থানীয় পরিবহন, আবাসন, খাবারের দোকান এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা সরাসরি জড়িত। ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর পর্যটন খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম অনেকাংশে নির্ভরশীল।

বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপ জরুরি হয়ে উঠেছে। অবরোধের কারণে পর্যটনকেন্দ্রটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি পর্যটকদের আস্থাতেও প্রভাব পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আলোচনার মাধ্যমে চলমান বিরোধের সমাধান হবে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং সাজেকে পর্যটন কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হবে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!