ঢাকা রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬

menu

দরিদ্রদের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসা বেশি, উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জাতীয় জরিপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১১:৫৮ এএম

দরিদ্রদের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসা বেশি, উদ্বেগ বাড়াচ্ছে জাতীয় জরিপ

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে ৩০ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। বিপরীতে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ।

শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা নিয়ে এমন ফলাফল জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ, সিসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু, যা শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব ক্ষতির প্রভাব শিশুর শিক্ষা, সামাজিক বিকাশ ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার ওপরও পড়তে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘সোশ্যাল প্যাটার্নিং অব এলিভেটেড ব্লাড লিড অ্যামাং চিলড্রেন এজড ১২-৫৯ মান্থস ইন বাংলাদেশ: অ্যা ন্যাশনাল ক্রস-সেকশনাল অ্যানালাইসিস অব মিকস ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণাটি চলতি মাসের ১৪ অক্টোবর চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাপত্র প্রকাশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মেডআর্কাইভে প্রকাশিত হয়।

গবেষকেরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) থেকে পাওয়া উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এই জরিপে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, জীবনযাত্রা এবং পরিবেশগত ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

প্রতি ১০০ শিশুর প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা রয়েছে। অর্থাৎ, এই বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসার মাত্রা গবেষণায় ব্যবহৃত সীমায় বা তার ওপরে।

গবেষণায় প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসার উপস্থিতিকে উচ্চমাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এই সীমাকে নিরাপদ মাত্রা হিসেবে ধরা যাবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়।

মিকসের তথ্য বিশ্লেষণে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। পরিবারের সম্পদ অনুযায়ী শিশুদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে দেখা যায়, সম্পদের শ্রেণি যত ওপরে উঠেছে, সিসার উচ্চমাত্রার হারও তত বেড়েছে।

সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে এ হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ হলেও সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে তা ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ। দুই শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান ২১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।

গবেষণায় পরিবারের সম্পদ, মায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বসবাসের এলাকা, ঘরের অবস্থা এবং অন্যান্য আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক বজায় ছিল। তবে কোন নির্দিষ্ট পণ্য বা পরিবেশগত উৎসের কারণে ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসা বেশি পাওয়া যাচ্ছে, তা এই গবেষণায় আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়নি।

ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসা বেশি কেন?

ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন বলেছেন, তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারের শিশুদের প্যাকেটজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বেশি হতে পারে। এ ছাড়া এসব পরিবারের ঘরে আসবাব, দেয়ালের রং, সাজসজ্জার সামগ্রী ও বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র বেশি থাকতে পারে। এসব পণ্য বা উপকরণের কোনো কোনোটিতে সিসা থাকতে পারে।

তাঁর মতে, এসব পণ্যের সংস্পর্শ শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের সম্ভাব্য পথ হতে পারে। তবে গবেষণায় প্যাকেটজাত খাবার, আসবাব কিংবা দেয়ালের রং পরীক্ষা করে সিসার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এগুলোকে ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার প্রমাণিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাও মনে করেন, সচ্ছল পরিবারের শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার বিভিন্ন সুযোগ থাকতে পারে। তাঁর মতে, আমদানি করা খেলনা, ঘরের সাজসজ্জার সামগ্রী এবং খাদ্যপণ্যের মাধ্যমে সিসার সংস্পর্শ ঘটতে পারে। পোলট্রির মুরগির খাদ্যে সিসার উপস্থিতি থাকলে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমেও মানুষের শরীরে তা প্রবেশ করার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সিসার প্রকৃত উৎস শনাক্ত করতে খাবার, খেলনা, রং, গৃহস্থালি সামগ্রী, পানি, ধুলা এবং আশপাশের পরিবেশের নমুনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কেবল পরিবারের আর্থিক অবস্থার সঙ্গে সিসার উচ্চমাত্রার সম্পর্ক পাওয়া গেলেই নির্দিষ্ট কোনো পণ্যকে দায়ী করা যায় না।

শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে বড় ঝুঁকি

সিসা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। কারণ, জীবনের প্রথম পাঁচ বছরে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত বিকশিত হয়। এ সময় বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে এলে স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সিসার প্রভাবে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে। মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, শেখার অসুবিধা, আচরণগত পরিবর্তন এবং বিকাশে বিলম্ব দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি সিসার সংস্পর্শ রক্তস্বল্পতা, কিডনির ক্ষতি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সিসার ক্ষতি সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। কোনো শিশুকে বাইরে থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ মনে হলেও তার মস্তিষ্কের বিকাশ বা শেখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে কেবল শারীরিক লক্ষণ দেখে শিশুর শরীরে সিসার প্রভাব নির্ণয় করা কঠিন।

শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লার মতে, উচ্চমাত্রার সিসার সংস্পর্শে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে তুলনামূলক কম মাত্রার সংস্পর্শেও শিশুর বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সিসা মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করার পাশাপাশি স্নায়ুর কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও কমে যেতে পারে।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা ও অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে তাঁদের কাছে স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু আসার প্রবণতা বেড়েছে। তবে শিশুদের এ ধরনের সমস্যার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু চিকিৎসকদের কাছে রোগীর সংখ্যা বাড়ার অভিজ্ঞতা দিয়ে সিসাকে এসব সমস্যার একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

আগের গবেষণাতেও সিসা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সম্পর্ক

বাংলাদেশে শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি এবং তাদের বিকাশের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে। ২০১৬ সালে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল হেলথে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সিরাজদিখান ও পাবনার ৫২৪ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

২০ থেকে ৪০ মাস বয়সী শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা পরিমাপের পাশাপাশি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মোটর বিকাশ মূল্যায়ন করা হয়েছিল। গবেষণায় সিরাজদিখানের শিশুদের রক্তে তুলনামূলক বেশি সিসা পাওয়া যায়। ওই এলাকার শিশুদের ক্ষেত্রে রক্তে সিসার মাত্রার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পরীক্ষায় কম স্কোর পাওয়ার সম্পর্কও দেখা যায়।

এ ছাড়া ২০২০ সালে জার্নাল অব নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারস সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের ৭৩৪ শিশুকে নিয়ে করা আরেকটি গবেষণায় জন্মের সময় নাড়ির রক্তে সিসার মাত্রা এবং দুই থেকে তিন বছর বয়সে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণায় অপুষ্টিজনিত খর্বাকৃতির শিশুদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সিসার সংস্পর্শের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক স্কোর কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে সব এলাকায় এই সম্পর্ক একই রকম ছিল না।

গবেষকদের ধারণা, অপুষ্টি বা খর্বাকৃতি শিশুদের সিসার ক্ষতিকর প্রভাবের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। এসব গবেষণার ফলাফল শিশুদের পরিবেশগত ঝুঁকি, পুষ্টি এবং বিকাশকে একসঙ্গে বিবেচনা করার গুরুত্ব তুলে ধরে।

তবে কোনো দুটি বিষয়ের মধ্যে পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া মানেই একটি বিষয় অন্যটির সরাসরি কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। শিশুর বিকাশে পুষ্টি, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য পরিবেশগত উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা সবচেয়ে বেশি

মিকসের প্রাথমিক ফলাফলে দেশের বিভাগভেদেও শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার বড় পার্থক্য দেখা গেছে। রাজধানী ঢাকায় ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৬৫ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। সিলেটে এ হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ।

অন্যদিকে বরিশালে ২৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে।

এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকায় হার সবচেয়ে বেশি এবং রাজশাহীতে সবচেয়ে কম। তবে বিভাগভিত্তিক পার্থক্যের কারণ শুধু জনসংখ্যার ঘনত্ব বা নগরায়ণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। পরিবেশদূষণ, শিল্পকারখানা, যানবাহন, পণ্যের মান, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং বসবাসের পরিবেশসহ একাধিক বিষয় এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষকদের সমন্বিত পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণেও বিভাগভেদে পার্থক্য পাওয়া গেছে। বরিশালকে তুলনার ভিত্তি ধরে বিশ্লেষণে ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সঙ্গে বেশি সম্পর্ক এবং রাজশাহীতে কম সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে এই ফলাফল থেকে কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশগত উৎসকে দায়ী করতে আরও অনুসন্ধান প্রয়োজন।

জাতীয় জরিপে কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে?

গবেষকেরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে বা মিকসের তথ্য ব্যবহার করেছেন। ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এই জরিপে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের রক্তে সিসাসহ কয়েকটি ভারী ধাতুর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।

জরিপে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১৮ হাজার ৯০৫ শিশুকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৬২২ শিশুর রক্তে সিসার পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। বিভিন্ন আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে করা মূল বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ৯ হাজার ৭১৭ শিশুর।

গবেষকেরা নতুন করে শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করেননি। বরং জাতীয় জরিপে আগে থেকে সংগ্রহ করা রক্ত পরীক্ষার ফল এবং পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য ব্যবহার করে পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করেছেন।

এই পদ্ধতিতে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি ও অঞ্চলের শিশুদের মধ্যে সিসার উচ্চমাত্রার বিস্তার এবং এর সঙ্গে আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক বোঝা সম্ভব হয়েছে। তবে এটি একটি ক্রস-সেকশনাল বা নির্দিষ্ট সময়ের উপাত্তভিত্তিক গবেষণা। ফলে সিসার নির্দিষ্ট উৎস, সংস্পর্শের সময়কাল কিংবা কোনো নির্দিষ্ট উপাদানই উচ্চমাত্রার জন্য দায়ী কি না, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধে কী করা জরুরি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়। তাই সিসার সংস্পর্শ কমানোই প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

এ জন্য শিশুদের খেলনা, রং, খাদ্যপণ্য, পানির উৎস এবং গৃহস্থালি সামগ্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যেসব পণ্যে সিসা থাকার আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলোর মান পরীক্ষা এবং বাজারে নিরাপদ পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা ও অন্যান্য দূষণকারী উৎস থেকে পরিবেশে সিসা ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

শিশুদের ঘরের ধুলা ও দূষিত মাটির সংস্পর্শ কমানো, খাবারের আগে ও বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং শিশুদের নাগালের মধ্যে পুরোনো রং বা অজানা উপাদানযুক্ত সামগ্রী না রাখা সহায়ক হতে পারে। তবে এসব ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি সিসার উৎস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে সরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সিসার সংস্পর্শের আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে সিসার মাত্রা পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর শরীরে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেলে সম্ভাব্য উৎস শনাক্ত করে তা থেকে সংস্পর্শ বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো বা ভিটামিন গ্রহণের মাধ্যমে সিসার বিষক্রিয়া প্রতিরোধ করা যায় না।

১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে পালিত হচ্ছে ১৪তম আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধে’। প্রতিপাদ্যটি সিসার সংস্পর্শ শনাক্ত করার পাশাপাশি এর উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার গুরুত্ব তুলে ধরে।

শিশুদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

জাতীয় জরিপের ফলাফল বলছে, বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের মধ্যে বেশি হার পাওয়া প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

তবে এই ফলাফলকে শুধু ধনী পরিবারের জীবনযাপন বা পণ্য ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত করে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ অজানা থেকে যেতে পারে। সিসার উৎস শনাক্ত করতে খাদ্য, খেলনা, গৃহস্থালি সামগ্রী, পানি, ধুলা, মাটি ও পরিবেশগত অন্যান্য উপাদানের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা কমাতে স্বাস্থ্য, পরিবেশ, শিল্প, খাদ্যনিরাপত্তা ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত পরীক্ষা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সিসাযুক্ত পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশের ক্ষতি অনেক সময় স্থায়ী হতে পারে। তাই সমস্যা দেখা দেওয়ার পর চিকিৎসার ওপর নির্ভর করার চেয়ে সিসার সংস্পর্শ প্রতিরোধ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় জরিপে উঠে আসা এই চিত্র শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্যকর্মী, গবেষক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্বের বিষয়টি সামনে এনেছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!