ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

menu

বিআরটি প্রকল্প বাতিল, অক্ষত থাকবে অধিকাংশ অবকাঠামো; স্টেশন ভাঙতে ব্যয় ৭২ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০১:২১ পিএম

বিআরটি প্রকল্প বাতিল, অক্ষত থাকবে অধিকাংশ অবকাঠামো; স্টেশন ভাঙতে ব্যয় ৭২ কোটি টাকা

ছবিঃ সংগৃহীত

দীর্ঘ ১৪ বছরেও কাঙ্ক্ষিত বাসসেবা চালু করতে না পারায় আলোচিত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে প্রকল্পের অধিকাংশ অবকাঠামো অক্ষত রাখা হবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, যানজট কমানো ও সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে বিআরটি স্টেশনসহ কিছু স্থাপনা ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব কাজ বাস্তবায়নে ব্যয় হতে পারে প্রায় ৭২ কোটি টাকা।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল দ্রুত, নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে যাত্রী পরিবহন নিশ্চিত করা। কিন্তু একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানো, ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘসূত্রতার পরও প্রকল্পের বিশেষায়িত বাসসেবা চালু হয়নি। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে। প্রকল্পের সর্বশেষ প্রস্তাবিত ব্যয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা।

প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তের পর এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কেন কাঙ্ক্ষিত সেবা চালু করা গেল না এবং এই ব্যর্থতার দায় কার? একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগের অবসান ঘটাতে অবশিষ্ট অবকাঠামো কীভাবে কাজে লাগানো হবে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

১৪ বছরেও চালু হয়নি বিআরটি বাসসেবা

ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে যানজট কমিয়ে যাতায়াত সহজ করার উদ্দেশ্যে ২০১২ সালে বিআরটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্দিষ্ট লেনে বিশেষায়িত বাস চলাচলের কথা ছিল। এতে যাত্রীরা তুলনামূলক কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন বলে আশা করা হয়েছিল।

কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে একের পর এক জটিলতা দেখা দেয়। নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতা, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। পাঁচ দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধন ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সর্বশেষ প্রস্তাবিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হওয়ার পরও বিশেষায়িত বাসসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।

নির্মাণকাজে বছরের পর বছর দুর্ভোগ

বিআরটি প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলাকালে গাজীপুর, টঙ্গী, উত্তরা ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিন ধরে যানজট ও চলাচলসংক্রান্ত দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও দূরপাল্লার যাত্রীদের প্রতিদিনই দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকতে হয়েছে।

মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণকাজ, সড়কের সংকুচিত অংশ এবং যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে যানজট কমবে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত বাসসেবা চালু না হওয়ায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

বর্তমানে বিআরটি লেনের কিছু অংশে সাধারণ যানবাহন চলাচল করছে। অন্যদিকে, ব্যবহার না হওয়া কয়েকটি স্টেশন কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও এসব স্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ভাসমান মানুষের অবস্থানের কথাও জানা গেছে।

যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু স্টেশন

বিআরটি প্রকল্পের কিছু অবকাঠামো এখন মহাসড়কে যান চলাচলের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় সড়কের ব্যবহারযোগ্য অংশ সংকুচিত হয়ে পড়ায় যানবাহনের চাপ বাড়ছে। উড়ালপথের নিচের কিছু অংশেও সড়ক সরু হয়ে যাওয়ায় চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। এর সঙ্গে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বাস ও ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকার কারণে যানজট আরও তীব্র হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের সব অবকাঠামো ভেঙে না ফেলে যেসব স্থাপনা যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে, সেগুলো অপসারণের সুপারিশ করেছে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ কমিটি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝের সড়ক দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখে স্টেশনসংলগ্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করা গেলে মহাসড়কের সক্ষমতা বাড়তে পারে। এতে যানবাহনের গতি স্বাভাবিক রাখা এবং যানজট কমানো সহজ হবে।

৯৬ শতাংশ অবকাঠামো অক্ষত রাখার সুপারিশ

বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক ড. সামছুল হক জানিয়েছেন, বিআরটি প্রকল্পের প্রায় ৯৬ শতাংশ অবকাঠামো অক্ষত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁর মতে, দূরপাল্লার যানবাহন দ্রুত চলাচলের জন্য মাঝের সড়কটি আগের মতো ব্যবহার করা যাবে। তবে যেসব স্থানে বিআরটি স্টেশন নির্মাণের কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে, সেসব স্টেশন ভেঙে ফেলা প্রয়োজন।

অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, প্রকল্পের অধিকাংশ অবকাঠামো অক্ষত থাকবে। মাঝের সড়ক দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা বহাল রাখা হবে। তবে বিআরটি স্টেশনগুলো যানজটের উৎস হয়ে থাকায় সেগুলো অপসারণ করতে হবে। এতে যানবাহন আরও দ্রুত চলাচল করতে পারবে।

তিনি আরও জানান, সড়কে নিরাপদ ও গতিশীল যান চলাচল নিশ্চিত করতে কিছু অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) প্রাক্কলন অনুযায়ী, স্টেশন ভাঙতে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা এবং ব্যারিয়ার স্থাপন করে যানবাহনের দ্রুত চলাচল নিশ্চিত করতে আরও প্রায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। সব মিলিয়ে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৭২ কোটি টাকা।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিআরটি প্রকল্প চালু রাখলে ভবিষ্যতে আরও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারত। তবে প্রকল্প বাতিল ও অবকাঠামো অপসারণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং ব্যয়ের অনুমোদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

প্রকল্প বাতিলে হতাশ সাধারণ মানুষ

বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কে যাতায়াত করা মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অথচ বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যে বাসসেবা চালুর কথা ছিল, তা শেষ পর্যন্ত চালু হয়নি।

সাধারণ যাত্রীদের প্রত্যাশা, প্রকল্পের অবশিষ্ট অবকাঠামো এমনভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, যাতে মহাসড়কে যানজট কমে এবং স্বাভাবিক যান চলাচল নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা অপসারণের কাজ দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের মতে, শুধু স্টেশন ভেঙে ফেললেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সড়কে অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণ, বাস-ট্রাকের শৃঙ্খলাপূর্ণ চলাচল, সড়কের সংকুচিত অংশের উন্নয়ন এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।

ব্যয় বৃদ্ধি ও দীর্ঘসূত্রতার দায় নির্ধারণের দাবি

বিআরটি প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, বারবার মেয়াদ বাড়ানো এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। সমালোচকদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই, বাস্তবায়ন সক্ষমতা, ব্যয় নির্ধারণ এবং জনদুর্ভোগের বিষয়গুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।

প্রকল্প বাস্তবায়নে কোথায় পরিকল্পনাগত ঘাটতি ছিল, কেন সময়মতো কাজ শেষ করা যায়নি এবং ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কী কী কারণ কাজ করেছে—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি বাড়াতে হবে। সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকল্পের সুফল যেন সরাসরি সাধারণ মানুষ পায়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

সামনে কী হবে বিআরটি অবকাঠামোর?

বিআরটি প্রকল্প বাতিলের পর এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যমান অবকাঠামোকে কীভাবে জনস্বার্থে ব্যবহার করা যায়। বুয়েটের বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, অধিকাংশ অবকাঠামো অক্ষত রেখে প্রয়োজনীয় কিছু স্থাপনা অপসারণ করা হলে সড়কের ব্যবহারযোগ্য অংশ বাড়তে পারে।

তবে এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, সড়ক ব্যবস্থাপনা, যানবাহন চলাচলের শৃঙ্খলা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ৭২ কোটি টাকার ব্যয় কীভাবে নির্ধারণ ও অনুমোদন করা হবে, কোন কোন স্থাপনা ভাঙা হবে এবং কাজ শেষ করতে কত সময় লাগবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘ ১৪ বছরের প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে বিআরটি বাসসেবা চালু না হওয়া দেশের বড় পরিবহন অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, প্রকল্পের অবশিষ্ট অবকাঠামো যেন আর জনদুর্ভোগের কারণ না হয়; বরং দ্রুত ও নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হয়।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!