জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন কর্মচারী ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, জালিয়াতি, দুর্নীতি এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৯ সালে নিম্ন বিভাগীয় সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার পর মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে তিনি প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে নিজের ভাইকে সরকারি চাকরি পাইয়ে দিতে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং সাম্প্রতিক নিয়োগ কার্যক্রমে একাধিক প্রার্থীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অনুসন্ধানী সূত্রের বরাতে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁদের দাবি, এনবিআরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে একটি চক্র সক্রিয় ছিল, যার সঙ্গে ফুয়াদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর পক্ষে পূর্ণাঙ্গ নথিপত্র, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ফলাফল স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
অনুসন্ধানী সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বাসিন্দা আলী আকবর ও রিনা আক্তার দম্পতির সন্তান ফুয়াদ হাসান আকন্দ ২০১৯ সালে এনবিআরে নিম্ন বিভাগীয় সহকারী হিসেবে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেন এবং একপর্যায়ে নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরির একটি অপেক্ষাকৃত নিম্ন পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাঁর নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে ওঠে। ঢাকায় ফ্ল্যাট, জমি এবং ময়মনসিংহের ত্রিশালে পরিবারের সদস্যদের নামে স্থাবর সম্পত্তি কেনার কথাও উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, ক্রয়ের সময়, অর্থের উৎস, মালিকানার ধরন এবং বাজারমূল্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য দলিলভিত্তিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের যে দাবি করা হয়েছে, সেটিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সম্পদের প্রকৃত হিসাব নির্ধারণে আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, দলিল, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বৈধ আয়ের উৎস পরীক্ষা করা জরুরি।
নিয়োগ বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ
ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের একটি বড় অংশ এনবিআরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে নিয়োগকে কেন্দ্র করে। কর অঞ্চল-১২-এর কয়েকজন কর্মচারীর অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তিনি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। এ কাজে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করা হতো বলেও দাবি করেছেন তাঁরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরিপ্রার্থীদের সরকারি পদে নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হতো। তবে কোন কোন পদে কতজন প্রার্থীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে, মোট কত টাকা লেনদেন হয়েছে এবং অর্থ আদায়ের সঙ্গে আর কারা জড়িত ছিলেন—এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও আর্থিক প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদনকারীদের তালিকা, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল, নিয়োগসংক্রান্ত নথি এবং যোগদানপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগকারী ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের বক্তব্য নিয়ে আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
নিজের ভাইকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ
ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, তিনি জালিয়াতির মাধ্যমে নিজের ভাই শামীম আশরাফকে সরকারি চাকরি পাইয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছেন। অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, শামীম আশরাফের নিয়োগের ক্ষেত্রে ঠিকানা ও জেলা কোটা-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে অনিয়ম করা হয়েছিল।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফুয়াদ ও তাঁর পরিবারের স্থায়ী নিবাস ময়মনসিংহের ত্রিশালে হলেও শামীম আশরাফের ঠিকানা হিসেবে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর তথ্য ব্যবহার করা হয়। ঢাকা জেলার কোটা কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তাঁকে উচ্চমান সহকারী পদে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং সরকারি কেন্দ্রীয় সার্ভারে সংরক্ষিত ঠিকানার তথ্যের মধ্যে অসংগতি ছিল। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল নথি, ঠিকানা পরিবর্তনের ইতিহাস, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত এবং নিয়োগের সময় জমা দেওয়া কাগজপত্র পরীক্ষা না করে এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বর্তমানে শামীম আশরাফ কর সার্কেল-২৬৩ (সাভার)-এ উচ্চমান সহকারী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া এর আগে অন্য একটি কর অঞ্চলে তাঁর ভাইকে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু যাচাই-বাছাই ও যোগ্যতার প্রশ্নে তা সফল হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কর্তৃপক্ষের নথি বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে শামীম আশরাফের নিয়োগসংক্রান্ত নথি, আবেদনপত্রে দেওয়া ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, কোটা প্রয়োগের ভিত্তি এবং নিয়োগ কমিটির সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়াও জরুরি।
সর্বশেষ নিয়োগে ১১ প্রার্থীকে অনিয়মের মাধ্যমে চাকরি দেওয়ার দাবি
নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ শুধু অতীতের কোনো একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে দাবি করেছেন অনুসন্ধানী সূত্রের ব্যক্তিরা। তাঁদের ভাষ্য, গত সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অন্তত ১১ জন প্রার্থীকে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রার্থীর প্রত্যেকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রার্থীদের নাম, পদ, নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষার ফলাফল, নিয়োগপত্র এবং অর্থ লেনদেনের প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পদগুলোর নিয়োগবিধি, প্রার্থীদের যোগ্যতা, পরীক্ষার নম্বর, মেধাতালিকা, কোটা প্রয়োগ এবং চূড়ান্ত নিয়োগের অনুমোদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোনো প্রার্থী নিয়মবহির্ভূত সুবিধা পেয়েছেন কি না, সেটিও নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত।
অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অভিযোগে উল্লিখিত কোনো ব্যক্তির দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সমীচীন নয়।
ঢাকায় ফ্ল্যাট, ত্রিশালে জমি—সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, জমি এবং অন্যান্য সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ময়মনসিংহের ত্রিশালে পরিবারের সদস্যদের নামে জমি ও স্থাবর সম্পত্তি কেনার কথাও উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবি, এসব সম্পদের মূল্য কয়েক কোটি টাকা। তবে সম্পত্তিগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান, দলিল নম্বর, ক্রয়ের তারিখ, মালিকানা এবং মূল্য সম্পর্কে যাচাইযোগ্য নথি প্রকাশ করা হয়নি।
সরকারি কর্মচারীর আয় ও সম্পদের মধ্যে অসংগতি আছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য শুধু সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বৈধ আয়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ, ঋণ, বিনিয়োগ, পারিবারিক সম্পদ এবং ঘোষিত সম্পদ বিবরণীও বিবেচনায় নিতে হয়।
এ ক্ষেত্রে ভূমি নিবন্ধন কার্যালয়ের দলিল, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির নামজারি, কর নথি, ব্যাংক হিসাব এবং অন্যান্য আর্থিক নথি পরীক্ষা করলে সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ থাকলেই তা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর অবৈধ সম্পদ হিসেবে গণ্য হয় না। তবে সম্পদ কেনার অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের বিষয়ে অসংগতি পাওয়া গেলে তা তদন্তের বিষয় হতে পারে।
বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা
ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে তিনি ফোন ধরেননি বলে দাবি করা হয়েছে। পরে অভিযোগের বিস্তারিত উল্লেখ করে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, তাঁর ভাই শামীম আশরাফের নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ, কর অঞ্চল-১২-এর কর্মচারীদের দাবি এবং সর্বশেষ নিয়োগে ১১ প্রার্থীকে অনিয়মের মাধ্যমে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা সুষ্ঠু সাংবাদিকতা ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের মতে, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, বরং রাজস্ব প্রশাসনের প্রতি জনসাধারণের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র জানতে এনবিআরের নিয়োগসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ, অভিযোগকারী ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের তথ্য যাচাই এবং সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে তদন্তের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবে অভিযোগের গুরুত্ব যতই বেশি হোক, তদন্তে প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। নথিপত্র, আর্থিক তথ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তই পারে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে।

