সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ হামলায় হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাতে প্রকাশিত এক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, হামলায় আহত ব্যক্তিদের আঘাতের মাত্রা সামান্য থেকে গুরুতর পর্যন্ত। তাঁদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালগুলোতে নেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট ধরন, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রমে কতটা প্রভাব পড়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে একের পর এক নিরাপত্তা ঘটনার মধ্যে দাম্মামের এই হামলা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে।
শায়বাহ তেলক্ষেত্রে ড্রোন প্রতিহত, নিহত ২
দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলার আগে বুধবার সকালে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা শায়বাহ তেলক্ষেত্রেও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটে। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তেলক্ষেত্রের একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে আসা একটি ড্রোন সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রতিহত করে।
তবে প্রতিহত করা ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষের আঘাতে দুজন নিহত হন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এ ঘটনায় তেলক্ষেত্রের কার্যক্রমে কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা বিঘ্ন ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সৌদি আরবের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় তেলক্ষেত্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে এসব স্থাপনার আশপাশে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র-সংশ্লিষ্ট ঘটনা ঘটলে তা শুধু নিরাপত্তা নয়, জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার খবর
সৌদি আরবে সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে একাধিক হামলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নের খবর পাওয়া গেছে। এর আগে গত ১১ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি প্রজেক্টাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রজাতীয় বস্তু আঘাত হানার ঘটনায় একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হওয়ার খবর জানিয়েছিল দেশটির কর্তৃপক্ষ।
এর আগের দিন, ১০ অক্টোবর একই বিমানবন্দরে আরও একটি প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব ঘটনার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, হামলাগুলোর সুনির্দিষ্ট উৎস এবং দায়ীদের পরিচয় সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন। একাধিক স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার খবর সৌদি আরবের বেসামরিক পরিবহন, জ্বালানি অবকাঠামো ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ইয়েমেন সংঘাত ঘিরে বাড়ছে আঞ্চলিক উত্তেজনা
সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের সংঘাতকে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইয়েমেনের হুতি বাহিনী এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের মধ্যে বিরোধ ও সংঘাতের কারণে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। সৌদি আরবও ইয়েমেন সংকটের সঙ্গে জড়িত আঞ্চলিক পক্ষগুলোর অন্যতম।
এই সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়েছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ব্যবহার আঞ্চলিক সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর, তেলক্ষেত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা হলে বেসামরিক মানুষের জীবনহানির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে দাম্মাম বিমানবন্দর ও শায়বাহ তেলক্ষেত্রের সাম্প্রতিক ঘটনার জন্য কারা দায়ী, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনে নিরাপত্তা সতর্কতা
সৌদি আরবে ধারাবাহিক হামলার খবরের মধ্যে নিজেদের নাগরিক ও কূটনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলো থেকে কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অবিলম্বে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মার্কিন কূটনৈতিক মিশন থেকেও কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে রিয়াদের মার্কিন দূতাবাস সৌদি আরবে নতুন করে হামলার আশঙ্কার বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা সতর্কবার্তাও জারি করেছে। এ পদক্ষেপ থেকে দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
কূটনৈতিক কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সাধারণত নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে নেওয়া হয়। তবে এ পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবে মার্কিন কূটনৈতিক কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
দাম্মাম বিমানবন্দর ও শায়বাহ তেলক্ষেত্র ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিমানবন্দরগুলো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, যাত্রী পরিবহন ও বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে তেলক্ষেত্রগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
এসব স্থাপনায় হামলা বা নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটলে স্থানীয় পর্যায়ে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে। তবে বর্তমান ঘটনাগুলোর কারণে তেল উৎপাদন বা সরবরাহে বাস্তবে কতটা প্রভাব পড়েছে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী তথ্যের প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলায় হতাহতের ঘটনা এবং শায়বাহ তেলক্ষেত্রে ড্রোন প্রতিহত করার ঘটনায় সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। একই সময়ে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তা পদক্ষেপ পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরেছে। হামলার দায়, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরবর্তী অগ্রগতি এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে রয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও রয়টার্স।

