ঢাকা বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

menu

হুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদিতে টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করছে যুক্তরাজ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রকাশিত: অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম

হুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদিতে টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করছে যুক্তরাজ্য

ছবিঃ সংগৃহীত

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ শহর, বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও কৌশলগত অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই প্রতিরক্ষামূলক মিশন পরিচালিত হবে। যুক্তরাজ্য সরকারের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হুথিদের ধারাবাহিক হামলার পর দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শনাক্ত করা, সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা করা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা জোরদার করার লক্ষ্য রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং মঙ্গলবার এক লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মোতায়েন করা যুদ্ধবিমানগুলো প্রতিরক্ষামূলক দায়িত্ব পালন করবে। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযান পরিচালনা করা এ মিশনের উদ্দেশ্য নয়।  সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির জ্বালানি স্থাপনা, বন্দর, বিমানবন্দর ও পরিবহন অবকাঠামো আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে এসব স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা হলে তার প্রভাব শুধু সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আকাশসীমা সুরক্ষায় যুক্তরাজ্যের যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

টাইফুন যুদ্ধবিমান বহুমুখী সামরিক অভিযানে ব্যবহারের উপযোগী। আকাশ প্রতিরক্ষা, শত্রুপক্ষের বিমান শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় এ ধরনের যুদ্ধবিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সৌদি আরবে মোতায়েন করা বিমানগুলোর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, অবস্থান ও দায়িত্ব পালনের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের দীর্ঘদিনের সংঘাত চলছে। সৌদি আরব ইয়েমেনের স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এই বিরোধের কারণে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

২০১৪ সালে হুথিরা রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। পরবর্তী সময়ে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট হস্তক্ষেপ করে। সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সাম্প্রতিক হামলার ফলে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার খবর সামনে আসায় দেশটির নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বর থেকে ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর সৌদি আরবের আকাশসীমা সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। হুথিদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি বাহিনীর পাশাপাশি মিত্র দেশগুলোর সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিমানবন্দর ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলার অভিযোগ

সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হুথিদের হামলার বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন সামনে এসেছে। এর মধ্যে কিং খালেদ বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এলাকায় হামলার অভিযোগ রয়েছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রকাশিত তথ্যে বিমানবন্দর ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলায় হতাহতের কথা বলা হয়েছে। তবে এসব হামলার প্রতিটি ঘটনার লক্ষ্যবস্তু, ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা হলে তেল উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহনের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে বিমানবন্দর বা বন্দরে হামলা হলে বেসামরিক পরিবহন, পণ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ কারণে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করা শুধু সামরিক নিরাপত্তার বিষয় নয়; দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে প্রাণহানি

সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাতের পাশাপাশি ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইয়েমেনের মধ্যাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশে একটি সামরিক শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৭৩ জনের বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর এক মুখপাত্রের দাবি, আতাক শহরের কাছে আল-আলাম শিবিরে হুথিরা তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী হতাহত হন।

অন্যদিকে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র দাবি করেছেন, সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট বাহিনীর সমাবেশকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

তবে হামলার প্রকৃত পরিস্থিতি, হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবির স্বাধীন যাচাই ছাড়া ঘটনাটির সব বিবরণ নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

ইয়েমেনের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সামরিক স্থাপনা ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলার ঝুঁকি বাড়ায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সৌদি হামলায় হতাহতের দাবি হুথিদের

হুথি-পরিচালিত ইয়েমেনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সৌদি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণে অন্তত ১৪১ জন নিহত এবং ৩৯৫ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে এসব পরিসংখ্যান হুথি-নিয়ন্ত্রিত কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য। হতাহতের সংখ্যা এবং হামলার পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে।

ইয়েমেনের সংঘাতের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও হতাহতের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই সামরিক ও বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা নির্ধারণে নিরপেক্ষ সূত্র এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণের গুরুত্ব রয়েছে।

আঞ্চলিক সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপ

সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় যুক্তরাজ্যের টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এর মাধ্যমে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় মিত্রদের সমন্বিত উদ্যোগ জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, এই মিশনের উদ্দেশ্য প্রতিরক্ষামূলক। ফলে যুদ্ধবিমান মোতায়েনের অর্থ হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শুরু করা নয়; বরং সৌদি আরবের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করাই এর ঘোষিত লক্ষ্য।

বিশ্লেষকদের কাছে পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদারের পাশাপাশি ইয়েমেনের সংঘাত কমানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়। সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকলে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের পাশাপাশি বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যেও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, হুথিদের হামলার মুখে সৌদি আরবের নিরাপত্তা জোরদারে যুক্তরাজ্যের যুদ্ধবিমান মোতায়েনের সিদ্ধান্ত দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নির্ভর করবে সামরিক উত্তেজনা প্রশমন, কূটনৈতিক আলোচনা এবং ইয়েমেনে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ওপর।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!