ভারতে সরকার পরিবর্তনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন অভিনেতা ও অধিকারকর্মী প্রকাশ রাজ। তবে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান কিংবা নেপালের ২০২৫ সালের সরকার পতনের ঘটনার মতো পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের বাস্তবতাকে এক করে দেখতে নারাজ তিনি। তাঁর মতে, ভারতে সরকার পরিবর্তন হতে হবে নির্বাচন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রস্তাবিত ‘তিরঙ্গা মিছিল’ ঘিরে বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এসব কথা বলেন প্রকাশ রাজ। ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বিরোধী মতের প্রতি সরকারের আচরণ নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকাশ রাজ বলেছেন, তাঁরা বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চান, তবে সেই পরিবর্তন ঘটাতে হবে গণতান্ত্রিক উপায়ে। এ জন্য তিনি উত্তর প্রদেশ থেকে শুরু করে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত নির্বাচনি লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন।
প্রকাশ রাজের বক্তব্যে একদিকে যেমন সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে সেই পরিবর্তন আনার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
‘আমরা বাংলাদেশ বা নেপাল নই, আমাদের সংবিধান আছে’
ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের তুলনা টেনে প্রকাশ রাজ বলেন, ভারত একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্র। দেশটিতে সরকার পরিবর্তনের জন্য নির্বাচন, ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা নেপাল নই। আমরা বাংলাদেশ নই। আমাদের আম্বেদকর আছেন। আমাদের গান্ধী আছেন। আমাদের ভগৎ সিং আছেন। আমাদের সংবিধান আছে। আমাদের ভোট দেওয়ার অধিকার আছে।’
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রকাশ রাজ বোঝাতে চেয়েছেন, ভারতের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ হতে হবে দেশটির নিজস্ব গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। ভারতের সংবিধানপ্রণেতা বি আর আম্বেদকর, অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী এবং বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের নাম উল্লেখ করে তিনি নাগরিক অধিকার, প্রতিবাদ ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন সরকারের পতন এবং নেপালে ২০২৫ সালে গণবিক্ষোভের মুখে সরকার পরিবর্তনের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সরাসরি তুলনা না করে দেশটির সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন প্রকাশ রাজ।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক
প্রকাশ রাজের বক্তব্যের পেছনে রয়েছে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম এবং নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বিরোধী পক্ষের অভিযোগ। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন—এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক চলছে।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নেতাকর্মীরা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। এ বিষয়ে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে যোগ্য নাগরিকদের নাম বাদ পড়া বা সংশোধন কার্যক্রমে অনিয়মের আশঙ্কা থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের অবস্থান, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং সরকারি ব্যাখ্যা পর্যালোচনা ছাড়া ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমে অনিয়ম হয়েছে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
তিরঙ্গা মিছিলের আগে আটক, প্রশ্ন প্রকাশ রাজের
শুক্রবার নয়াদিল্লিতে প্রস্তাবিত তিরঙ্গা মিছিলের আগে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেকে আটকের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রকাশ রাজ। তাঁর অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠরোধ করতে কেন্দ্রীয় সরকার বলপ্রয়োগ করছে।
প্রকাশ রাজের বক্তব্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন না। বরং তাঁদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে প্রতিবাদকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাদের আলোচনার সুযোগ দিচ্ছেন না, উল্টো শক্তি প্রয়োগ করছেন। আপনারা আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছেন।’
প্রকাশ রাজের দাবি, নাগরিকেরা যখন সরকারের নীতি, নির্বাচনব্যবস্থা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন তাঁদের বক্তব্য শোনার পরিবর্তে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও আইনি প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী ব্যাখ্যা দিয়েছে—তা যাচাই করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব।
‘আমাদের অস্ত্র সংবিধান ও প্রতিবাদের অধিকার’
সরকার পরিবর্তনের দাবি কিংবা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে নৈরাজ্যের সঙ্গে এক করে দেখার বিরোধিতা করেছেন প্রকাশ রাজ। তাঁর মতে, নাগরিকদের প্রশ্ন তোলা, প্রতিবাদ করা এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ করা সাংবিধানিক অধিকার।
তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই। আমাদের অস্ত্র হলো সংবিধান। আমাদের অস্ত্র হলো প্রতিবাদ করার অধিকার।’
এই বক্তব্যে তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে অহিংস প্রতিবাদ ও সাংবিধানিক অধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, সরকারের নীতির বিরোধিতা করা কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তন দাবি করা নিজেই নৈরাজ্য নয়; বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে।
প্রকাশ রাজের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি শুধু রাজপথের প্রতিবাদের কথা বলেননি; নির্বাচনি লড়াইয়ের মাধ্যমেও পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। উত্তর প্রদেশ থেকে শুরু করে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার যে কথা তিনি বলেছেন, তাতে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনি কৌশলের ইঙ্গিত রয়েছে।
‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন
বিক্ষোভকারীদের জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল করার উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ প্রচারাভিযান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রকাশ রাজ।
তিনি বলেন, ‘আমি মোদিজিকে জিজ্ঞাসা করছি, আপনার “হর ঘর তিরঙ্গা” স্লোগানের কী হলো? এ দেশের তরুণেরা তিরঙ্গা নিয়ে এগিয়ে যেতে চান।’
প্রকাশ রাজের বক্তব্যের মূল সুর ছিল, জাতীয় পতাকা বহন করে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানো নাগরিকদের অধিকারকে সম্মান করা উচিত। তাঁর অভিযোগ, তিরঙ্গা মিছিলের আগে বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনা সরকারের ঘোষিত দেশপ্রেমের বার্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর, এমনকি নারীদের ওপরও পুলিশি সহিংসতার অভিযোগ করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশ রাজ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও আহ্বান জানান, যেন তারা সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে এ বিষয়ে সরব হয়। তাঁর মতে, নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ নিয়ে সংসদে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
২০২৯ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক লড়াইয়ের বার্তা
প্রকাশ রাজের বক্তব্যে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচনি লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে সরকার পরিবর্তনের দাবিকে দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে সরকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্বাচন, রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক সক্ষমতা, ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে প্রকাশ রাজের বক্তব্যকে কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ নির্বাচনি রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করা যায়।
তবে তাঁর বক্তব্য কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না। নির্বাচনের ফল নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি, জনসমর্থন, নির্বাচনি পরিবেশ এবং ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর।
ভারতের গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা
প্রকাশ রাজের মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদের পরিসর নিয়ে বিতর্ক চলছে। এসব বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, নাগরিক সমাজ এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ভিন্ন হতে পারে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন যেমন সরকার পরিবর্তনের প্রধান পথ, তেমনি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও মতপ্রকাশও নাগরিক অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ভোটারদের অধিকার এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
প্রকাশ রাজ তাঁর বক্তব্যে সরকার পরিবর্তনের দাবি জানালেও সহিংস বা অসাংবিধানিক পথের পরিবর্তে নির্বাচন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর এই অবস্থান ভারতের রাজনৈতিক বিতর্কে গণতান্ত্রিক অধিকার ও নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
এখন দেখার বিষয়, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগ, বিক্ষোভকারীদের আটক এবং প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে বিতর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী অবস্থান নেয়। পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কী ধরনের রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে, সেটিও ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

