ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

menu

পাকিস্তানে স্কুলের ছাদ ধসে ২৭ শিক্ষার্থীসহ নিহত ২৮, আহত ১৯

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০২:৩৩ পিএম

পাকিস্তানে স্কুলের ছাদ ধসে ২৭ শিক্ষার্থীসহ নিহত ২৮, আহত ১৯

ছবিঃ সংগৃহীত

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের পেশোয়ার শহরে একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে ২৭ শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষিকাসহ অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১৯ জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকালে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেশোয়ারের আল খায়ের স্কুলের প্রথম তলার ছাদ ধসে পড়লে শ্রেণিকক্ষে থাকা শিক্ষার্থীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে। দুর্ঘটনার সময় স্কুলে শ্রেণি কার্যক্রম চলছিল। ফলে মুহূর্তেই সেখানে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।

পেশোয়ারের লেডি রিডিং হাসপাতালের (এলআরএইচ) মুখপাত্র মুহাম্মদ আসিম ডন-কে জানান, দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৮ জনে দাঁড়িয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২৭ জন শিক্ষার্থী এবং একজন শিক্ষিকা রয়েছেন। আহত ১৯ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে শিক্ষার্থীরা

পেশোয়ারের ডেপুটি কমিশনার আফাক ওয়াজির জানান, আল খায়ের স্কুলের ছাদ ধসে পড়ার পর শিক্ষার্থীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে। খবর পেয়ে উদ্ধারকারীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন।

ধসে পড়া ছাদ ও ভবনের ভাঙা অংশের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে তৎপরতা চালানো হয়। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দিতে লেডি রিডিং হাসপাতালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ডেপুটি কমিশনার উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে আর কোনো শিশু আটকে নেই।

ছয় সন্তান পড়ত স্কুলে, প্রাণে বাঁচল এক ছেলে

দুর্ঘটনার ভয়াবহতা উঠে এসেছে অভিভাবকদের বক্তব্যেও। সামিউল্লাহ নামের এক অভিভাবক জানান, বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি স্কুলে ছুটে যান। সেখানে পৌঁছে তিনি আট বছরের কম বয়সী তিন শিশুকে উদ্ধার করেন।

তিনি জানান, তাঁর ছয় সন্তান ওই স্কুলে পড়ত। দুর্ঘটনার সময় তাঁর এক ছেলে পানি পান করতে শ্রেণিকক্ষের বাইরে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যায়।

এ ধরনের ঘটনা দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর ওপর কী ভয়াবহ মানসিক আঘাত তৈরি করে, তা সহজেই অনুমেয়। তবে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের বিস্তারিত পরিচয় এবং তাঁদের অবস্থা সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে সব তথ্য পাওয়া যায়নি।

আহতদের চিকিৎসায় হাসপাতালে জরুরি অবস্থা

লেডি রিডিং হাসপাতালের মুখপাত্র মুহাম্মদ আসিম বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, নিহত শিক্ষার্থীদের সবার বয়স ১৩ বছরের নিচে। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

একটি স্কুল ভবনে এমন দুর্ঘটনায় এতসংখ্যক শিশুর প্রাণহানির ঘটনা ভবনের নিরাপত্তা, নির্মাণমান এবং নিয়মিত পরিদর্শনব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, এ ঘটনা তা আবারও সামনে এনেছে।

পাকিস্তানে স্কুল ও ভবন ধসের পুনরাবৃত্তি

পাকিস্তানে বিভিন্ন সময়ে ভবন, দেয়াল ও ছাদ ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, ভবন রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং নিরাপত্তা তদারকির দুর্বলতাকে এ ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পেশোয়ারের স্কুলটির ছাদ ধসের নির্দিষ্ট কারণ এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের জুলাইয়ে উমরকোটের কাছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়াল ধসে তিনজন নিহত হন। একই মাসে লাহোরের বাগবানপুরায় নির্মাণাধীন একটি স্কুলের ছাদ ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এর আগে জুনে লাহোরের কাহনায় একটি টিউশন সেন্টারের ছাদ ধসে ১৪ শিশু নিহত হয়। এর দুই মাস আগে ডেরা গাজী খানেও ছাদ ধসে চার শিশুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া আগস্টে ইসলামাবাদে টানা বৃষ্টির সময় একটি বাড়ির ছাদ ধসে এক দম্পতির মৃত্যু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব ঘটনা ভবন নির্মাণের মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত কাঠামোগত পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশেষ করে স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি অপরিহার্য।

ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

পেশোয়ারের এ দুর্ঘটনায় নিহতদের অধিকাংশই অল্পবয়সী শিক্ষার্থী। ফলে ঘটনাটি শুধু একটি ভবন ধসের দুর্ঘটনা নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

স্কুল ভবনের নকশা অনুমোদন, নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা, ভবনের ধারণক্ষমতা যাচাই এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যায়। একই সঙ্গে কোনো ভবনে কাঠামোগত ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় মেরামত বা ভবনটি ব্যবহার বন্ধ করার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

তবে আল খায়ের স্কুলের ভবনটি নির্মাণের সময় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, ছাদ ধসের পেছনে কাঠামোগত ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি নাকি অন্য কোনো কারণ দায়ী—এসব বিষয়ে তদন্তের ফল পাওয়া গেলে প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে।

পেশোয়ারের এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ২৭ শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষিকার প্রাণহানি পাকিস্তানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনেছে। এখন নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এমন প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!