সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরপর দুই দিন হামলার ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। রোববার (১১ অক্টোবর) দ্বিতীয় দফার হামলায় অন্তত একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এর আগের দিন একই বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে দাবি করা হয়েছে। ধারাবাহিক এসব হামলায় সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থা, বেসামরিক বিমান চলাচল এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভবিষ্যতে আরও হামলা চালানোর হুমকিও দিয়েছে গোষ্ঠীটি। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হামলার কঠোর জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পরিস্থিতি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কী ঘটেছে?
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, রোববার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালের একটি অংশে আগুন ধরে যায়। হামলার পরপরই সেখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয় এবং ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সৌদি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, হামলায় একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হয়েছেন। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে একজন পাকিস্তানি নাগরিকের মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের ধরন, সেটি কীভাবে বিমানবন্দরে আঘাত হানল এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রম কতটা ব্যাহত হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
আগের দিনের হামলায় ব্যাপক হতাহতের দাবি
এর আগে শনিবার একই বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনায় ব্যাপক হতাহতের দাবি করা হয়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০৮ জন আহত হন।
নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি নাগরিক, চার সৌদি নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, মিসর ও ভারতের নাগরিক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব হতাহতের সংখ্যা ও নিহতদের জাতীয়তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য যাচাই করা জরুরি।
ঘটনাটি সত্য হলে, আন্তর্জাতিক যাত্রী ও বেসামরিক কর্মীদের উপস্থিতি থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে এ ধরনের হামলা বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, যাত্রী পরিবহন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়তে পারে।
হামলার দায় স্বীকার করে হুথিদের নতুন হুমকি
হুথি বাহিনীর সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি হামলার দায় স্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তিনি সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মক্কা ও মদিনা ছাড়া সৌদি আরবের অন্য বিমানবন্দর ও আকাশসীমায় হামলার হুমকি দিয়েছে হুথিরা। পাশাপাশি দাম্মাম বিমানবন্দর এবং বিভিন্ন তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবিও করেছে গোষ্ঠীটি।
তবে হুথিদের এসব দাবি এবং হামলার প্রকৃত পরিধি স্বাধীন সূত্রে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বেসামরিক বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি বাস্তবায়িত হলে সৌদি আরবের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সানা বিমানবন্দরে হামলার প্রতিশোধ?
হুথি মুখপাত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের রাজধানী সানার বিমানবন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সাম্প্রতিক বিমান হামলার প্রতিক্রিয়ায় তাদের এই অভিযান শুরু হয়েছে।
ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং হুথি বাহিনী পরস্পরের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে। এ সংঘাতের সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থও জড়িয়ে রয়েছে। ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত প্রায়ই সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে সানা বিমানবন্দরে হামলার সময়, ক্ষয়ক্ষতি এবং রিয়াদের ঘটনার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্কের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রয়োজন।
সৌদি জোটের কঠোর প্রতিক্রিয়ার ঘোষণা
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বিমানবন্দরে হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে হামলার জবাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
বেসামরিক বিমানবন্দর ও যাত্রীদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনার ক্ষেত্রে ঘটনার প্রকৃতি, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন, হামলার উদ্দেশ্য এবং প্রাসঙ্গিক আইনগত তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সৌদি আরব পাল্টা সামরিক অভিযান চালালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, খাদ্য সরবরাহ এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা
হামলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হবে কি না, সে বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিলে তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইয়েমেনের সংঘাত এবং ইরানের আঞ্চলিক ভূমিকা নিয়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, অভিযানের ধরন কিংবা সময়সূচি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগ কেন বাড়ছে?
সৌদি আরবের জন্য রিয়াদ ও দাম্মামের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগর এবং বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, জ্বালানি খাত, বাণিজ্য ও পর্যটনব্যবস্থার সঙ্গে এসব স্থাপনা সরাসরি যুক্ত।
বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার হুমকি বাস্তবে রূপ নিলে কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রভাব পড়তে পারে—
বিমান চলাচল: ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন, নিরাপত্তা তল্লাশি বৃদ্ধি এবং যাত্রী চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
জ্বালানি খাত: তেল স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।
অর্থনীতি ও বিনিয়োগ: নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে ব্যবসা, পর্যটন এবং বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রবাসীদের নিরাপত্তা: সৌদি আরবে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসী ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
তবে এসব সম্ভাব্য প্রভাবের বাস্তবতা নির্ভর করবে হামলার মাত্রা, বিমানবন্দরের কার্যক্রম, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের ওপর।
সৌদি-হুথি সংঘাতের পটভূমি
ইয়েমেনের সংঘাত দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম জটিল সংকট হিসেবে বিবেচিত। দেশটির হুথি আন্দোলন রাজধানী সানাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের পক্ষে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি বিভিন্ন সময়ে সামরিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা রেখেছে।
হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ইয়েমেনের সংঘাত বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে হুথিদের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপকে সরাসরি ইরানের নির্দেশে পরিচালিত বলে ধরে নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট ঘটনার প্রমাণ ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে ২০২২ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে হওয়া অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি জুলাই মাসে ভেঙে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতির নির্দিষ্ট তারিখ, ভেঙে যাওয়ার সময় এবং বর্তমান সংঘাতের সঙ্গে এর সম্পর্ক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করা জরুরি।
সংলাপে সহায়তার প্রস্তাব ইরানের
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের মধ্যে সংলাপ সহজতর করতে তাঁর দেশের সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সংঘাত প্রশমনে কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সংলাপের উদ্যোগ কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব হলে তা সৌদি আরব, ইয়েমেন এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
রিয়াদের বিমানবন্দরকে ঘিরে ধারাবাহিক হামলার দাবি, হুথিদের নতুন হুমকি এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের কঠোর প্রতিক্রিয়ার ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অবস্থান এবং ইরানের কূটনৈতিক উদ্যোগও পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে হামলা, হতাহতের সংখ্যা এবং দায় স্বীকারের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন সূত্রে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া জরুরি। বিশেষ করে বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলার মতো গুরুতর ঘটনায় যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা উচিত।

