চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক কনটেইনার টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত ৮ অক্টোবর ঢাকার বিনিয়োগ ভবনের মিলনায়তনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে এ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ১৫ বছরের জন্য টার্মিনালটি পরিচালনা করবে দুবাইভিত্তিক আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি।
এনসিটি আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি হালনাগাদ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন পাঁচ কোটি ডলার দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে চুক্তি সম্পন্ন হলেও এর পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে চুক্তির আর্থিক কাঠামো, রাজস্ব ভাগাভাগি, বিনিয়োগের শর্ত, নবায়নপ্রক্রিয়া এবং দেশের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বন্দর শ্রমিক ও বিভিন্ন সংগঠন চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের একাংশ আশা করছেন, বেসরকারি আন্তর্জাতিক অপারেটরের ব্যবস্থাপনায় বন্দরের কার্যক্রমে গতি আসবে এবং সেবার মান বাড়বে।
সব মিলিয়ে এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের অন্তর্ভুক্তি একদিকে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে চুক্তির স্বচ্ছতা, জাতীয় স্বার্থ এবং বিদ্যমান শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কও জোরালো করেছে।
১৫ বছরের চুক্তি, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ১৫ কোটি ডলার
গত ৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এইচ ই ইসা কারিম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির প্রাথমিক মেয়াদ ১৫ বছর। পরবর্তী সময়ে সহজ শর্তে নবায়নের বিধানও রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে নবায়নের সুনির্দিষ্ট শর্ত, মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা এবং উভয় পক্ষের দায়দায়িত্বের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর লক্ষ্য হিসেবে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, বিদ্যমান সরঞ্জাম হালনাগাদ এবং কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম আরও দক্ষ করার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
এ ছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন পাঁচ কোটি ডলার দেওয়ার বিষয়টিও চুক্তির আর্থিক কাঠামোর অংশ বলে জানা গেছে। তবে এই অর্থ কোন খাতে কীভাবে বিবেচিত হবে, বিনিয়োগের অর্থ কোন সময়সূচিতে ব্যয় করা হবে এবং প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বাস্তবায়নে কী ধরনের নিশ্চয়তা রয়েছে—এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর জানতে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক বড় হলেই কোনো চুক্তিকে লাভজনক বলা যায় না। বিনিয়োগের বিপরীতে বন্দর কর্তৃপক্ষ কী পরিমাণ আয় পাবে, পরিচালন ব্যয় কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেবার মানের সূচক কী থাকবে এবং চুক্তির শর্ত ভঙ্গ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বছরে অন্তত ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের শর্ত
জানা গেছে, চুক্তিতে বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। টিইইউএস বা টিইইউ বলতে ২০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনারের সমপরিমাণ একক বোঝানো হয়। আন্তর্জাতিক কনটেইনার পরিবহনে টার্মিনালের কার্যক্রম ও সক্ষমতা পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক এটি।
তবে গত অর্থবছরে দেশীয় অপারেটরের অধীনে এনসিটিতে ১৩ লাখের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে। একটি হিসাবে এ সংখ্যা ১৩ লাখ ৭৫ হাজার টিইইউএস, আরেকটি হিসাবে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক বলা হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যের এই পার্থক্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বার্ষিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
যদি প্রকৃত হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ১৩ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউএসের মধ্যে হয়ে থাকে, তাহলে চুক্তিতে উল্লেখিত ন্যূনতম লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান কার্যক্রমের তুলনায় কম। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠতে পারে, নতুন অপারেটরের কাছ থেকে শুধু ন্যূনতম লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নয়, বরং বিদ্যমান সক্ষমতা ধরে রাখা ও আরও বাড়ানোর বিষয়ে কী ধরনের শর্ত রাখা হয়েছে।
তবে ন্যূনতম হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা কম হওয়া মানেই চুক্তি ক্ষতিকর—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। কনটেইনারের ধরন, জাহাজের আকার, পরিচালন ব্যয়, সরঞ্জামের সক্ষমতা, টার্মিনালের কার্যদক্ষতা এবং চুক্তির অন্যান্য শর্ত বিবেচনায় নিতে হবে। এ বিষয়ে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি ও সংশ্লিষ্ট বছরের নির্ভুল পরিসংখ্যান প্রকাশ করা জরুরি।
কেন গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা, জাহাজের অপেক্ষার সময়, পণ্য খালাসের গতি এবং পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি প্রধান কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে এ টার্মিনালের মাধ্যমে বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে টার্মিনালটির পরিচালনব্যবস্থায় পরিবর্তন এলে তার প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক বন্দর কার্যক্রমে।
২০০৭ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া এনসিটির দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার। এতে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী জাহাজ ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা রয়েছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে টার্মিনালটি পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড।
এনসিটির গুরুত্ব শুধু এর আয় বা কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। বন্দরের একটি বড় অংশের পণ্য ওঠানো-নামানোর কার্যক্রম এই টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর পরিচালনায় কোনো ধরনের বিঘ্ন হলে আমদানি-রপ্তানি, পণ্য সরবরাহ এবং ব্যবসায়িক ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে দক্ষ পরিচালনা, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং কার্যকর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জাহাজের অপেক্ষার সময় ও পণ্য খালাসের সময় কমানো সম্ভব হলে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হতে পারেন। তাই নতুন চুক্তির প্রকৃত সুফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কেবল বিনিয়োগ নয়, বাস্তবে সেবার মান ও দক্ষতা কতটা বাড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আওয়ামী লীগ আমল থেকে বিরোধিতা, আন্দোলন অব্যাহত
এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে বিরোধিতা নতুন নয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই এ-সংক্রান্ত চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারী, শ্রমিক সংগঠন, বাম রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি আপত্তি জানিয়ে আসছেন।
তাদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে বন্দরের মতো কৌশলগত অবকাঠামোর পরিচালনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া, দেশীয় অপারেটরের ভূমিকা, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং চুক্তির শর্তের স্বচ্ছতা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এনসিটি বিদেশিদের হাতে তুলে না দেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল কর্মবিরতি, সড়ক অবরোধ, বন্দর ভবন ঘেরাও এবং বন্দর কার্যক্রম বন্ধ রাখার মতো কর্মসূচি। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতৃত্বে কয়েকটি সংগঠন মিলে টানা নয় দিন বন্দর অচল রাখে। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেই এ কর্মসূচি পালন করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে শ্রমিকদের আপত্তি ও আন্দোলনের মধ্যেই গত ৮ অক্টোবর চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। এতে বিরোধিতাকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
চুক্তি বাতিলের দাবিতে গণঅনশন, ১৯ অক্টোবর থেকে আমরণ অনশনের হুঁশিয়ারি
এনসিটি পরিচালনা নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিলের দাবিতে গত ১২ অক্টোবর সকালে চট্টগ্রাম বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারের সামনে গণঅনশন কর্মসূচি পালন করে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।
সংগঠনটির সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, এনসিটি নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করতে হবে। সরকারকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত আলোচনার সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কোনো উদ্যোগ নেওয়া না হলে ১৯ অক্টোবর থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘এনসিটির চুক্তিতে কী আছে, তা আমরা জানি না। দেশের জনগণও জানে না। আমরা চাই সরকার অবিলম্বে এই চুক্তি বাতিল করুক।’
সংগঠনটির মূল আপত্তি হলো, গুরুত্বপূর্ণ একটি বন্দর টার্মিনালের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার চুক্তির শর্ত সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা হয়নি। তাদের মতে, চুক্তির আর্থিক ও প্রশাসনিক শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে দেশের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে, তা মূল্যায়ন করা কঠিন।
তবে চুক্তি বাতিলের দাবি ও আন্দোলনের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং চুক্তির শর্ত প্রকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার সুযোগ তৈরি হলে শ্রমিকদের উদ্বেগ, ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা এবং সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা: বাড়ুক বন্দরের সক্ষমতা, কমুক ভোগান্তি
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক এনসিটি পরিচালনায় নতুন উদ্যোগের সম্ভাব্য সুফলের বিষয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত পাওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবসায়ীরা সমস্যার কথা জানান।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ী নেতারা অনেক সময় বন্দর চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। বেসরকারি খাতে পরিচালনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হলে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হতে পারেন। বিশেষ করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ বাড়লে বন্দরের কার্যক্রমে গতি আসতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে চুক্তির শর্ত সম্পর্কে তিনি নিজেও বিস্তারিত জানেন না বলে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দর ব্যবহারকারীদের শীর্ষ সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে চুক্তির বিষয়বস্তু, সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি এবং ব্যবসায়ীদের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে তাঁর জানা উচিত ছিল।
এ বক্তব্য চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরাও যদি চুক্তির আর্থিক ও পরিচালনাগত শর্ত সম্পর্কে অবগত না থাকেন, তাহলে বৃহত্তর ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা হলো, নতুন পরিচালনব্যবস্থা চালু হলে পণ্য খালাসে বিলম্ব কমবে, সেবার মান বাড়বে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ হবে। তবে এসব সুবিধা বাস্তবে কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
চুক্তি নিয়ে কথা বলতে রাজি নয় বন্দর কর্তৃপক্ষ
এনসিটি পরিচালনার চুক্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি, রাজস্ব ভাগাভাগি, বিনিয়োগ বাস্তবায়নের সময়সূচি, নবায়নের বিধান এবং চুক্তি বাতিলের শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এসব তথ্যের গুরুত্ব রয়েছে। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ করা হলে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, সরকারের আর্থিক সুবিধা, পরিচালনাগত দায়িত্ব এবং জনস্বার্থ সুরক্ষার বিধানগুলো পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে।
এ ক্ষেত্রে চুক্তির বাণিজ্যিকভাবে সংবেদনশীল তথ্যের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রধান শর্ত, আর্থিক কাঠামো এবং জবাবদিহির বিধান সম্পর্কে যথাযথ তথ্য প্রকাশের সুযোগ রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চুক্তির স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থই এখন বড় প্রশ্ন
এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি বিষয়—বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা এবং চুক্তির শর্তের স্বচ্ছতা। একদিকে আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন যন্ত্রপাতি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর প্রত্যাশা রয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আর্থিক শর্ত, দেশীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
চুক্তির প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য অন্তত কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ কোন সময়সীমায় বাস্তবায়িত হবে, এককালীন পাঁচ কোটি ডলারের অর্থপ্রদানের শর্ত কী, বন্দর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত কী পরিমাণ রাজস্ব বা ফি পাবে, ন্যূনতম কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং চুক্তি নবায়ন বা বাতিলের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।
একই সঙ্গে বর্তমান অপারেটরের অধীনে অর্জিত কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ, পরিচালন ব্যয় এবং সেবার মানের সঙ্গে নতুন ব্যবস্থার তুলনামূলক মূল্যায়ন প্রয়োজন। এতে বোঝা যাবে, নতুন চুক্তির মাধ্যমে বন্দরের আয়, উৎপাদনশীলতা ও সেবার মান কতটা বাড়তে পারে।
শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পরিচালনব্যবস্থায় বিদ্যমান কর্মীদের কী হবে, তাঁদের চাকরি ও সুযোগ-সুবিধা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্টতা থাকলে বিরোধ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে কারা?
চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এর পরিচালনব্যবস্থায় পরিবর্তনের সুফল শুধু বন্দর কর্তৃপক্ষ বা অপারেটর প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, পণ্য পরিবহনকারী, শ্রমিক এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরও।
নতুন ব্যবস্থায় পণ্য খালাস দ্রুত হলে ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় কমতে পারে। আবার পরিচালন ব্যয় বা সেবার মাশুল বাড়লে তার প্রভাবও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়তে পারে। তাই চুক্তির সফলতা নির্ধারণে বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি বন্দরের দক্ষতা, রাজস্ব আয়, সেবার মান, শ্রমিকদের অধিকার এবং ব্যবহারকারীদের ব্যয়—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হলেও টার্মিনাল হস্তান্তর ও পূর্ণাঙ্গ পরিচালন কার্যক্রম শুরু হতে আরও কয়েক মাস লাগতে পারে বলে বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে চুক্তির শর্ত প্রকাশ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগের জবাব এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা স্পষ্ট করা গেলে বিতর্ক নিরসনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এনসিটির পরিচালনায় নতুন চুক্তি কি সত্যিই বন্দরের সক্ষমতা বাড়াবে, ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি কমাবে এবং দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করবে? নাকি চুক্তির শর্ত অপ্রকাশিত থাকায় বিতর্ক আরও বাড়বে? এর উত্তর নির্ভর করবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত, বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।

