ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজের সরাসরি নজরদারি, ৩২ সিসিটিভি ও ১৮ মনিটর স্থাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম

শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজের সরাসরি নজরদারি, ৩২ সিসিটিভি ও ১৮ মনিটর স্থাপন

ছবিঃ সংগৃহীত

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ হ্যান্ডলিং কার্যক্রম সরাসরি দেখার ব্যবস্থা চালু করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। বিমানবন্দরের আটটি লাগেজ বেল্ট এলাকায় ৩২টি সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ৬৫ ইঞ্চির ১৮টি মনিটর স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো, পরিবহন, বাছাই এবং যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ সরাসরি দেখার সুযোগ পাবেন যাত্রীরা।

বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, লাগেজ ব্যবস্থাপনায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে যাত্রীরা তাঁদের লাগেজের অবস্থান ও হ্যান্ডলিং কার্যক্রম দেখতে পারবেন। এতে লাগেজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং কোনো অনিয়ম বা সমস্যা হলে তা শনাক্ত করা সহজ হবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

আটটি লাগেজ বেল্টে ৩২টি সিসিটিভি ক্যামেরা

বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দরের আটটি লাগেজ বেল্টের ব্যাগেজ এলাকায় প্রতিটিতে চারটি করে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরায় ধারণ করা দৃশ্য ৬৫ ইঞ্চির ১৮টি মনিটরে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।

এ ব্যবস্থার আওতায় উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানোর পর তা কীভাবে পরিবহন করা হচ্ছে, কোথায় বাছাই করা হচ্ছে এবং কীভাবে নির্ধারিত বেল্টে পৌঁছাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

বিমানবন্দরে লাগেজ পেতে দেরি হওয়া, ব্যাগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা লাগেজ হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ যাত্রীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের বিষয়। নতুন নজরদারি ব্যবস্থা এসব অভিযোগের কারণ শনাক্ত করতে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে।

তবে ক্যামেরার মাধ্যমে সরাসরি দৃশ্য দেখার ব্যবস্থা চালু হলেই সব ধরনের অনিয়ম বন্ধ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কার্যকর নজরদারি, ফুটেজ সংরক্ষণ, অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে।

লাগেজ হারানো ও চুরি ঠেকাতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি

বিমানবন্দরে লাগেজ হারানো, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কাটা ও চুরির ঘটনা প্রতিরোধে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। গত ১০ আগস্ট মন্ত্রণালয়ের আইন-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়।

ছয় সদস্যের এ কমিটি লাগেজ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ধাপ পর্যালোচনা করে স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি বাড়ানোর লক্ষ্যে একাধিক সুপারিশ দেয়।

কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারলাইন অপারেটরস কমিটির (এওসি) চেয়ারম্যান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাহক সেবা ও কার্গো বিভাগের পরিচালক এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের পরিচালক।

কমিটির সুপারিশের মধ্যে উড়োজাহাজ থেকে লাগেজ নামানো থেকে শুরু করে আগমন এলাকার লাগেজ বেল্টে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করার বিষয়টি ছিল। নতুন সিসিটিভি ও মনিটর স্থাপনের উদ্যোগকে এ ধরনের নজরদারি জোরদারের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সিসিটিভির আওতার বাইরে থাকা স্থানেও নজরদারির সুপারিশ

তদন্ত কমিটি বিমানবন্দরের যেসব স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা নেই, সেসব এলাকা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ক্যামেরা স্থাপনের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ে নিয়োজিত কর্মীদের শরীরে ক্যামেরা চালু রাখার বিষয়টিও সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কমিটির মতে, লাগেজ পরিবহন ও হ্যান্ডলিংয়ের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে নজরদারি থাকলে কোনো ব্যাগ হারানো, কাটা বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের কার্যক্রম যাচাই করা সহজ হবে।

এ ছাড়া সিসিটিভি ও শরীরে ধারণ করা ক্যামেরার ফুটেজ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং আকস্মিক পরিদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যবস্থা কার্যকর হলে অভিযোগের তদন্তে প্রমাণ সংগ্রহ এবং দায়িত্ব নির্ধারণের সুযোগ বাড়বে।

লাগেজ ব্যবস্থাপনায় কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহি

লাগেজ হ্যান্ডলিং কার্যক্রম আরও নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করতে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপদ লাগেজ ব্যবস্থাপনা এবং মানসম্মত পরিচালন পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, লাগেজ চুরি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এতে দায়িত্ব পালনে অবহেলা কমবে এবং যাত্রীদের মালামালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ জনবল, সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষতিগ্রস্ত লাগেজের বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তার সুপারিশ

তদন্ত কমিটি আন্তর্জাতিক ও ট্রানজিট ফ্লাইটের লাগেজ ব্যবস্থাপনায়ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। কোনো ব্যাগ যাত্রার মূল বা ট্রানজিট বিমানবন্দরে কাটা, খোলা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্কবার্তা পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ই-মেইলের মাধ্যমে ব্যাগের ছবি পাঠানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত লাগেজে পরিচিতি-স্টিকার লাগানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এর ফলে যাত্রী ব্যাগ গ্রহণের আগেই সমস্যাটি সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াও সহজ হতে পারে।

এ ছাড়া মূল্যবান সামগ্রী লাগেজে না রাখার বিষয়ে যাত্রীদের সচেতন করতে প্রচারণা চালানোর কথা বলা হয়েছে। বিমানবন্দরে লাগেজ ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে নিজস্ব জনসংযোগ দল বা গণমাধ্যম সেল গঠনের সুপারিশও করেছে কমিটি।

যাত্রীসেবায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর লক্ষ্য বেবিচকের

বেবিচক জানিয়েছে, যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষা, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর ও যাত্রীবান্ধব সেবা সম্প্রসারণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের দৃশ্য সরাসরি দেখার ব্যবস্থা চালু হওয়ায় যাত্রীরা তাঁদের ব্যাগের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ফুটেজ যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে ক্যামেরাগুলো নিয়মিত সচল রাখা, ফুটেজ যথাযথভাবে সংরক্ষণ, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর। যাত্রীদের আস্থা অর্জনে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও ফলাফলের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা যাবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!