ঢাকা শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬

menu

পাবনার বেড়ায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক, এক যুগেই হারানোর পথে

পাবনা প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩, ২০২৬, ১১:০৪ এএম

পাবনার বেড়ায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক, এক যুগেই হারানোর পথে

ছবিঃ সংগৃহীত

পাবনার বেড়া উপজেলায় অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ সহজ করতে প্রায় এক যুগ আগে নির্মাণ করা হয়েছিল বড়শিলা-নলভাঙা-খাকছাড়া পাকা সড়ক। ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। কিন্তু নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সড়কটির আর কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ হয়নি। ফলে একসময়কার ব্যস্ত সড়কটি এখন অনেকটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। কোথাও রাস্তার ওপর জন্মেছে ঘন আগাছা ও লম্বা ঘাস। দুই পাশের ঝোপঝাড় রাস্তার ওপর এসে পড়ায় অনেক জায়গায় সড়কের অস্তিত্বই বোঝা যায় না। ফলে বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাচলও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

২০১৩ সালে নির্মাণ, ব্যয় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে বড়শিলা-নলভাঙা-খাকছাড়া সড়কটি নির্মাণ করা হয়।

বেড়া পৌরসভার বড়শিলা থেকে শুরু হয়ে চাকলা ইউনিয়নের নলভাঙা হয়ে খাকছাড়া পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। বিল এলাকার মধ্য দিয়ে নির্মিত এ সড়কটি ওই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যা অনেকটাই দূর করেছিল।

সড়কটি চালু হওয়ার পর বেড়া উপজেলা সদরের সঙ্গে চাকলা ও কৈটোলা ইউনিয়নের নলভাঙা, খাকছাড়া, চাকলা, দমদমা, জয়নগর, কৈটোলাসহ আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ সহজ হয়।

কৃষিপণ্য পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল সড়কটি

সড়কটি নির্মাণের আগে বিল এলাকার এসব গ্রামের মানুষের উপজেলা সদরে যাতায়াতে নানা ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হতো। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগব্যবস্থা আরও কঠিন হয়ে পড়ত।

পাকা সড়ক নির্মাণের পর কৃষকরা উৎপাদিত ফসল অপেক্ষাকৃত সহজে উপজেলা সদর ও স্থানীয় বাজারে নিতে পারতেন। শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত, রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলেও সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, নির্মাণের পর কয়েক বছর সড়কটি ব্যবহারযোগ্য থাকলেও ধীরে ধীরে বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। সময়মতো সংস্কার না হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে পুরো সড়কই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

নির্মাণের পর থেকেই পানির চাপ

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিল এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সড়কটি প্রয়োজনীয় উচ্চতা ও প্রশস্ততা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়নি। সড়কটি তুলনামূলক নিচু ও সরু হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে বিলের পানি উঠে বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করত।

তাদের দাবি, নির্মাণের প্রথম বছর থেকেই বৃষ্টি ও বিলের পানির চাপে সড়কের বিভিন্ন অংশে ভাঙন দেখা দেয়। পরে ছোটখাটো ক্ষতিগুলো সময়মতো মেরামত না করায় তা বড় আকার ধারণ করে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে সড়কটির স্থায়িত্ব আরও বাড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় সংস্কার না হওয়ায় এখন নতুন করে সড়ক নির্মাণ ছাড়া বিকল্প নেই।

সরেজমিনে সড়কের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া কঠিন

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বড়শিলা-নলভাঙা-খাকছাড়া সড়কের বিভিন্ন অংশে পিচ ও খোয়া উঠে গেছে। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। আবার কোনো কোনো অংশে রাস্তার ওপর ঘাস ও আগাছা জন্মে পুরো সড়ক ঢেকে গেছে।

সড়কের দুই পাশে ঝোপঝাড় বেড়ে ওঠায় অনেক জায়গায় রাস্তার প্রস্থও বোঝার উপায় নেই। কিছু অংশ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে সাধারণ যানবাহন চলাচল করা সম্ভব নয়।

ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেককে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে তাদের যাতায়াতের দূরত্ব ও সময় দুটোই বাড়ছে। কৃষিপণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও বাড়ছে অতিরিক্ত খরচ ও ভোগান্তি।

সবচেয়ে বেশি সমস্যায় কৃষক ও শিক্ষার্থীরা

সড়কটি অচল হয়ে পড়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে তাদের বিকল্প ও ঘুরপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য বাজারে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অসুস্থ রোগীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা অন্য কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার ক্ষেত্রেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পানি ও কাদায় চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ

পাবনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যে সড়কটি পরিদর্শন করেছেন।

তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে সড়কটি আমি পরিদর্শন করেছি। একটি প্রকল্পে সড়কটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বরাদ্দ এলেই পুনর্নির্মাণ করা হবে।’

এলজিইডির পক্ষ থেকে সড়কটি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার কথা জানানোয় স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা আশার সৃষ্টি হয়েছে। তবে দ্রুত বরাদ্দ নিশ্চিত করে কাজ শুরু না হলে দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

এক যুগে সড়কের এমন পরিণতি কেন?

১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কটি এক যুগের মধ্যেই কেন এমন বেহাল হয়ে পড়ল—এ প্রশ্নও তুলেছেন স্থানীয়রা।

তাদের মতে, শুধু নতুন করে সড়ক নির্মাণ করলেই হবে না; বিল এলাকার পানি প্রবাহ, সড়কের উচ্চতা, প্রস্থ ও টেকসই নির্মাণব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকাও জরুরি।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, নতুন প্রকল্পের আওতায় সড়কটি পুনর্নির্মাণের সময় এলাকার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় উচ্চতা ও মান নিশ্চিত করা হবে। দ্রুত কাজ শুরু হলে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট থেকে অন্তত ১০ গ্রামের মানুষ মুক্তি পাবেন বলে আশা করছেন তারা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!