পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব গিয়ে প্রতারণা ও চরম ভোগান্তির শিকার হওয়ার অভিযোগ করছেন বাংলাদেশের একাধিক যাত্রী। হজ ও ওমরাহ পালনে সহযোগিতার নামে কিছু লাইসেন্সবিহীন এজেন্সির পাশাপাশি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও প্রতিশ্রুত সেবা না দেওয়া, নিম্নমানের হোটেলে রাখা, পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত না করা এবং যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ উঠেছে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগে পড়ছেন ওমরাহযাত্রীরা।
হজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্সবিহীন এজেন্সির মাধ্যমে হজ ও ওমরাহ পালনে সৌদি আরব না যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে আসছে। তবে সতর্কতার পরও এ ধরনের অভিযোগ বন্ধ হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, ওমরাহযাত্রার আগে এজেন্সির বৈধতা যাচাই এবং লিখিত চুক্তির মাধ্যমে হোটেল, পরিবহন ও অন্যান্য সেবার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
জনপ্রতি ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা দিয়েও দুর্ভোগ
গত রমজানে একই পরিবারের ১২ সদস্য ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যান। প্রত্যেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা করে পরিশোধ করলেও সৌদি আরবে পৌঁছানোর পরই তাঁরা বিপাকে পড়েন বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, মদিনা বিমানবন্দরে পৌঁছে কোনো মোয়াল্লেম বা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিকে পাননি। আগে থেকে নির্ধারিত পরিবহনব্যবস্থাও ছিল না।
রমজান মাসে রোজা রেখে দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তির মধ্যে নিজেদের উদ্যোগে গাড়ি ভাড়া করে তাঁদের হোটেলে যেতে হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখা যায়, বাংলাদেশি এজেন্সির পক্ষ থেকে যে হোটেলের ছবি ও ভিডিও দেখানো হয়েছিল, বাস্তবের আবাসনব্যবস্থার সঙ্গে তার মিল নেই।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাঁদের পাঁচ তারকা হোটেলে রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মদিনায় পৌঁছে নিম্নমানের হোটেলে থাকতে হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিজেদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে তাঁদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়।
পরিবারটির সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, মদিনায় সাত রাত কাটানোর পর তাঁরা মক্কায় পৌঁছান। সেখানে তুলনামূলক ভালো হোটেল পেলেও সেটির অবস্থান পবিত্র কাবা শরিফ থেকে প্রতিশ্রুত দূরত্বের চেয়ে অনেক বেশি ছিল বলে তাঁদের অভিযোগ। ফলে ইবাদত পালনের পাশাপাশি যাতায়াতেও বাড়তি অসুবিধার মুখে পড়তে হয়।
বিমানবন্দর থেকেই শুরু হয় ভোগান্তি
ভুক্তভোগী এক নারী জানান, মদিনা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই তাঁদের দুর্ভোগ শুরু হয়। সেখানে তাঁদের জন্য কোনো যাতায়াতের বাস ছিল না। এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁরা সাড়া পাননি। যে হোটেলে থাকার কথা বলা হয়েছিল, সেখানেও তাঁদের নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ওই নারী বলেন, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর তাঁরা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন। এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিজেদের উদ্যোগেই পরিবহন ও আবাসনের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। পুরো সফরজুড়েই তাঁদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
পরিবারটির আরেক সদস্যের অভিযোগ, এজেন্সির পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব সেবার কোনো মিল ছিল না। পাঁচ তারকা হোটেলে রাখার কথা বলা হলেও তাঁদের নিম্নমানের হোটেলে নেওয়া হয়। পরে অনেক কষ্টে নিজেদের উদ্যোগে থাকার জায়গা খুঁজে নিতে হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, যে অর্থ নেওয়া হয়েছিল, তার বিপরীতে প্রতিশ্রুত সেবার অধিকাংশই তাঁরা পাননি। ফলে পবিত্র ওমরাহ পালনের মতো ধর্মীয় সফর তাঁদের কাছে দুর্ভোগের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
ফ্লাইট বাতিলের মধ্যেও যাত্রা, পরে নিজ খরচে ফেরার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের পরিস্থিতিতে একের পর এক ফ্লাইট বাতিল হওয়ার মধ্যেও তাঁদের জেদ্দা বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে নিজেদের উদ্যোগে অন্য বিমানের টিকিট কিনে পরদিন ঢাকায় ফিরতে হয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে যাত্রীদের ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য, ফ্লাইটের অবস্থা, বিকল্প ব্যবস্থা এবং জরুরি যোগাযোগের বিষয়ে এজেন্সির দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানকালে কোনো সমস্যা দেখা দিলে যাত্রীরা যেন দ্রুত সহায়তা পান, সে জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে ফ্লাইট বাতিলের পরিস্থিতিতে এজেন্সির সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার ভূমিকা এবং যাত্রীদের ফেরার খরচ কে বহন করেছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
অফিস গুটিয়ে চলে যাওয়ার অভিযোগ, দায় স্বীকার অন্য প্রতিষ্ঠানের
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পর অভিযুক্ত একটি এজেন্সি ধানমন্ডি এলাকার কার্যালয় গুটিয়ে চলে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ ও অভিযোগের বিষয়ে জবাব পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ভাটারা এলাকার আরেকটি প্রতিষ্ঠান এ ঘটনায় নিজেদের ভূমিকার দায় স্বীকার করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি মধ্যস্থতাকারী বা মিডিয়া হিসেবে কাজ করেছিল বলে জানা গেছে। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট দুই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, যাত্রীদের সঙ্গে করা চুক্তি, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং প্রতিশ্রুত সেবার বিবরণ যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কে মূল প্যাকেজ বিক্রি করেছে, কার মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে, সৌদি আরবে আবাসন ও পরিবহনের দায়িত্ব কার ছিল এবং যাত্রীরা কার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ী পক্ষ চিহ্নিত করা গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
লাইসেন্সবিহীন এজেন্সি নিয়ে হাবের উদ্বেগ
ওমরাহযাত্রীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগের বিষয়ে হজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশও অবগত বলে জানা গেছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহমেদ মজুমদার সময় সংবাদকে বলেন, লাইসেন্সবিহীন এজেন্সির মাধ্যমে ওমরাহযাত্রী পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থার কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, লাইসেন্সবিহীন এজেন্সির মাধ্যমে মানবপাচার ও স্বর্ণ চোরাচালানের মতো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এভাবে পাঠানো কিছু ব্যক্তি সৌদি আরবে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়, যা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।
হাবের সাধারণ সম্পাদক জানান, কোনো যাত্রী যাতে লাইসেন্সবিহীন এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যেতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো এজেন্সির মাধ্যমে ওমরাহ পালনে গিয়ে কেউ প্রতারিত হলে তাঁকে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
ওমরাহ প্যাকেজ নেওয়ার আগে যেসব বিষয়ে সতর্কতা জরুরি
সংশ্লিষ্টদের মতে, ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা করার সময় শুধু প্যাকেজের মূল্য বা প্রচারমূলক ছবি দেখে এজেন্সি নির্বাচন করা উচিত নয়। বরং কয়েকটি বিষয় আগেই যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথমত, এজেন্সির বৈধতা যাচাই: যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওমরাহ করতে যাবেন, তার প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদন আছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, লিখিত চুক্তি নেওয়া: প্যাকেজের মোট মূল্য, হোটেলের নাম ও মান, বিমানবন্দর থেকে যাতায়াত, মক্কা-মদিনায় পরিবহন, খাবার এবং অন্যান্য সেবার বিবরণ লিখিতভাবে নিতে হবে।
তৃতীয়ত, হোটেলের তথ্য নিশ্চিত করা: শুধু ছবি বা ভিডিওর ওপর নির্ভর না করে হোটেলের সঠিক নাম, ঠিকানা, অবস্থান এবং পবিত্র কাবা শরিফ থেকে দূরত্ব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিতে হবে।
চতুর্থত, জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা রাখা: সৌদি আরবে এজেন্সির প্রতিনিধি, স্থানীয় যোগাযোগ নম্বর এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা পাওয়ার উপায় আগে থেকেই জেনে নিতে হবে।
পঞ্চমত, অর্থ পরিশোধের প্রমাণ সংরক্ষণ: টাকা জমা দেওয়ার রসিদ, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য, চুক্তিপত্র, প্যাকেজের বিজ্ঞাপন এবং এজেন্সির সঙ্গে কথোপকথনের প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত। প্রতারণার অভিযোগ উঠলে এসব নথি অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রতারণা বন্ধে নজরদারি ও জবাবদিহি জরুরি
পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মানুষ সারা জীবনের সঞ্চয় থেকে অর্থ ব্যয় করেন। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ধর্মীয় এই সফরে যান। তাই প্রতিশ্রুত সেবা না পাওয়া, বিদেশে গিয়ে আবাসন ও পরিবহনসংকটে পড়া কিংবা এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; এটি যাত্রীদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ধর্মীয় সফরের অভিজ্ঞতার সঙ্গেও জড়িত।
লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি লাইসেন্সধারী এজেন্সির বিরুদ্ধেও ওঠা অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুত সেবা দিতে ব্যর্থ হলে তার কারণ, চুক্তির শর্ত এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান অনুযায়ী দায় নির্ধারণ করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতারিত যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত এবং প্রতিকার পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার।
ওমরাহযাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, হাব এবং এজেন্সিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আর যাত্রীদেরও ভ্রমণের আগে এজেন্সির বৈধতা ও প্যাকেজের শর্ত যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ওমরাহযাত্রার নামে প্রতারণা প্রতিরোধে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব হবে।

