ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও বিতর্কের কারণে প্রায়ই সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় থাকেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা পরীমনি। তবে এবার ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক বা বিরোধ নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহারের শিকার হয়ে আলোচনায় এসেছেন তিনি। সম্প্রতি এআই ব্যবহার করে পরীমনির নামে তৈরি একটি আপত্তিকর ডিপফেক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন এই অভিনেত্রী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি একটি স্বনামধন্য স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম পেজ হ্যাক করেও প্রচার করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে অনলাইনে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে ফেসবুক লাইভে এসে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন পরীমনি। তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং বিষয়টির ভয়াবহতা তুলে ধরেন।
সোমবার (২০ অক্টোবর) ঢাকার একটি শোরুম উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের জীবনের নানা ঝামেলা নিয়ে হাস্যরসের ছলে কথা বলেন পরীমনি। তবে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নারীর সম্মানহানির চেষ্টা নিয়ে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ।
‘সারাজীবন ঝামেলা হবে, ঝামেলা নিয়েই যাব’
জীবনে একের পর এক প্রতিকূলতা ও বিতর্কের মুখোমুখি হওয়া প্রসঙ্গে পরীমনি বলেন, তাঁর কপালে যেন সারাজীবন ঝামেলা লেখা রয়েছে। বিষয়টি এখন অনেকটাই মেনে নিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
পরীমনির ভাষায়, ‘আমার কপালে মনে হয় এটাই লেখা, সারাজীবন ঝামেলা হবে, ঝামেলা নিয়েই যাব! আমি তো এটা মেনেই নিয়েছি। এখন তো বেশ ভালোই লাগে, পুরাটাই এনজয় করি!’
নিজের জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে এমন রসিকতাপূর্ণ মন্তব্য করলেও এআই দিয়ে তৈরি আপত্তিকর ভিডিওর বিষয়টিকে মোটেও হালকাভাবে দেখছেন না এই অভিনেত্রী। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত জীবনে নানা পরিস্থিতি সামলে নেওয়া সম্ভব হলেও প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কারও সম্মানহানির চেষ্টা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উদ্বেগজনক বিষয়।
‘বিষয়টা মারাত্মক সেনসিটিভ’
পরীমনি জানান, প্রথম দিকে ভিডিওটি নিয়ে তিনি খুব একটা গুরুত্ব দেননি। নিজের মতো করে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে যখন দেখেন, ঘটনাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন প্রতিবাদ জানানো জরুরি হয়ে পড়ে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টা মারাত্মক সেনসিটিভ। আমার মতো শক্ত মানুষের তো প্রথম তিন-চার দিন এগুলো গায়েই লাগেনি, পাত্তাই দিইনি! কিন্তু যখন দেখলাম জল অনেক দূর গড়াচ্ছে আর বিষয়টাকে এভয়েড করা যাচ্ছে না, তখন সোচ্চার হতে বাধ্য হলাম।’
পরীমনির বক্তব্যে স্পষ্ট, ঘটনাটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সম্মানহানির বিষয় নয়; বরং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীদের লক্ষ্যবস্তু বানানো এবং তাঁদের সামাজিকভাবে হেয় করার প্রবণতাও এর সঙ্গে জড়িত।
‘অন্য কোনো সাধারণ মেয়ে হলে আত্মহত্যা করে বসত’
এআই দিয়ে তৈরি আপত্তিকর কনটেন্টের সম্ভাব্য মানসিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পরীমনি বলেন, তাঁর জায়গায় অন্য কোনো নারী থাকলে লোকলজ্জা ও সামাজিক চাপের কারণে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারতেন। এ ধরনের ঘটনার পর মানসিক বিপর্যয়ের খবরও সামনে আসে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পরীমনির ভাষায়, ‘আমার জায়গায় অন্য কোনো সাধারণ মেয়ে হলে তো এতক্ষণে লোকলজ্জার ভয়ে সুইসাইডই করে বসত! এমন ঘটনার পর আত্মহত্যার নিউজ অহরহই আমরা দেখি। তাই এআই দিয়ে নারীদের এমন চরিত্রহননের বিরুদ্ধে সবার একযোগে সোচ্চার হওয়াটা এখন সময়ের দাবি।’
তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে নারীদের হয়রানি, সামাজিক অপমানের ভয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি সামনে এসেছে। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে বাস্তব ব্যক্তির মুখ বা পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও তৈরি করা হলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির ফলে ছবি, কণ্ঠস্বর ও ভিডিও তৈরি বা সম্পাদনা করা আগের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। এই প্রযুক্তি শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও এর অপব্যবহার নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষ করে ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির মুখ, কণ্ঠস্বর বা পরিচয় ব্যবহার করে এমন ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যা দেখে অনেকের কাছে সেটিকে বাস্তব বলে মনে হতে পারে। অনুমতি ছাড়া কারও পরিচয় ব্যবহার করে আপত্তিকর বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়া ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মান ও ডিজিটাল নিরাপত্তার জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ।
পরীমনিকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই ঝুঁকিকেই সামনে এনেছে। তবে ভিডিওটি কারা তৈরি করেছে, কারা ছড়িয়েছে এবং টেলিভিশন চ্যানেলের ইনস্টাগ্রাম পেজ হ্যাক করার সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কাউকে দায়ী করা যায় না।
প্রতিবাদের পর সমর্থন পাচ্ছেন পরীমনি
এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুক লাইভে আসার পর ভক্ত-অনুরাগীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে সমর্থন পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন পরীমনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার জন্য অনেকে তাঁর সাহসের প্রশংসা করছেন। এতে তিনি আরও উৎসাহিত বোধ করছেন বলেও জানান।
পরীমনি বলেন, ‘সবাই যখন আমার এই সাহসের প্রশংসা করে, তখন বুকটা গর্বে ভরে যায়। মনে হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে আমি একদম সঠিক পথেই আছি।’
তাঁর এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্মান রক্ষা, নারীর নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
নারীর ডিজিটাল নিরাপত্তায় প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতামত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার আইনি পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে এআই ব্যবহার করে ভুয়া ও আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি, পরিচয় বিকৃত করা কিংবা তা ছড়িয়ে দিয়ে কাউকে হয়রানি করার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর প্রতি দোষারোপ না করে তাঁর সম্মান ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও বা ছবি দেখেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া কিংবা যাচাই ছাড়াই ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। সন্দেহজনক কনটেন্টের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
পরীমনির ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে শুধু ভুক্তভোগীর প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়। সামাজিক সচেতনতা, দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ, প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যথাযথ পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিতর্কের মধ্যেও এবার নিজের বিরুদ্ধে ছড়ানো আপত্তিকর ডিপফেক ভিডিওর প্রতিবাদে সরব হয়েছেন পরীমনি। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা—এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নারীর সম্মানহানির চেষ্টা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়; এর বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।

