দিনাজপুরের বীরগঞ্জে বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে পুকুরের জমি জবরদখল, জাল ও ভুয়া দলিল তৈরি করে হয়রানি এবং মাছ লুটের অভিযোগ উঠেছে। জমি উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের কাছে বিচার চাওয়ায় বাদী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে হুমকি ও হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ভুক্তভোগী আইয়ুব খান।
সংবাদ সম্মেলনে জমি দখলের অভিযোগ
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দিনাজপুর প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন বীরগঞ্জ উপজেলার শিবরামপুর ইউনিয়নের দৌউলী গ্রামের আবু তাহের খানের ছেলে আইয়ুব খান। এ সময় তার বাবা আবু তাহের খানও উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে আইয়ুব খান বলেন, তাদের বাড়ির পাশে প্রায় ৩ একর ৫৬ শতক জমির ওপর জগদল পুকুর রয়েছে। এর মধ্যে তার বাবা আবু তাহের খান ১৯৮৭ সালে রহিনি কুমার নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১ একর ৭৮ শতক জমি ক্রয় করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে আরও ৫৯ শতক জমি কেনা হয়। সব মিলিয়ে তাদের আওতায় থাকা পুকুরের জমির পরিমাণ প্রায় ২ একর ৩৭ শতক বলে দাবি করেন তিনি।
এই পুকুরে মাছ চাষ করেই তাদের পরিবারের জীবিকা চলে বলেও জানান আইয়ুব খান।
পারিবারিক বিরোধের সুযোগ নিয়ে দখলের চেষ্টা
আইয়ুব খানের অভিযোগ, পুকুরের কিছু অংশ তার চাচা সাফিজ উদ্দিনের দখলে রয়েছে। পারিবারিক বিরোধের সুযোগ নিয়ে চাচাতো ভাইদের সঙ্গে যোগসাজশ করে একই গ্রামের মো. খোকন খায়ের ছেলে এবং ১ নম্বর শিবরামপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. মাহাবুব ইসলাম খা দীর্ঘদিন ধরে তাদের পুকুরের জমি দখলের চেষ্টা করে আসছেন।
দখলে ব্যর্থ হয়ে ভুয়া ও জাল দলিল তৈরি করে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, ২০১৯ সালেও তাকে একটি মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছিল। পরে মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তা খারিজ করে দেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন আইয়ুব খান।
‘জাল দলিল দেখিয়ে পুকুর দখল’
আইয়ুব খান অভিযোগ করেন, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে মাহাবুব ইসলাম খা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। তার দাবি, ৮ আগস্ট ২০২৬ দলবল নিয়ে এসে জাল দলিল দেখিয়ে তাদের পুকুরের অংশ জোরপূর্বক দখল করে নেওয়া হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দখলের সময় পুকুরে থাকা প্রায় ২৫ লাখ টাকা মূল্যের মাছ মেরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আইয়ুব খানের ভাষ্য, ঘটনার পর তিনি পুলিশের কাছে ন্যায়বিচার চাওয়ার চেষ্টা করলেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে আইয়ুব খান নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন দাবি করে বলেন, তিনি কৃষিকাজ ও মাছ চাষের মাধ্যমে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করেন।
অন্যের জমি দখলেরও অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে আইয়ুব খান আরও দাবি করেন, একইভাবে এলাকার মোহাম্মদ আলীর জমি ভুয়া কাগজপত্র ও জাল দলিল তৈরি করে দখলের অভিযোগও রয়েছে মাহাবুব ইসলাম খার বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে দিনাজপুরের বীরগঞ্জ সহকারী জজ আদালতে ৭৭/২০২৩ নম্বর মামলা চলমান রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
পুকুরে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ
আইয়ুব খানের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মাহাবুব ইসলাম খা পুকুরে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন ও বিক্রি করছেন।
তিনি বলেন, জমি দখল, জাল দলিল তৈরি, বালু উত্তোলনসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
একই সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
নিরাপত্তাহীনতায় পরিবার
সংবাদ সম্মেলনে আইয়ুব খান নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও হয়রানির কারণে বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। বাড়ির বাইরে চলাচলের সময়ও নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করছেন তারা।
জমি ও পুকুরের মালিকানা নিয়ে বিরোধের সুষ্ঠু তদন্ত, দখল হয়ে থাকলে তা উদ্ধারে ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের দাবি জানান তিনি।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ভুক্তভোগী
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মো. মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু, সরকারদলীয় নেতাকর্মী এবং প্রশাসনের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন আইয়ুব খান।
তার দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে কেউ যেন জমি দখল কিংবা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, পুকুরের জমির মালিকানা যাচাই এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তে নির্ধারিত হবে
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতা মাহাবুব ইসলাম খার বিরুদ্ধে জমি দখল, জাল দলিল, মাছ নিয়ে যাওয়া, বালু উত্তোলন ও হুমকির যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা, জমির প্রকৃত মালিকানা, দলিলের বৈধতা এবং পুকুর দখলের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড, দলিলপত্র, আদালতের নথি ও প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগে উল্লেখ করা মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থাও যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

