ঢাকা শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

দিনাজপুরে ঐতিহ্যবাহী বউমেলা এখন মিলনমেলা, বদলে গেছে জীবনসঙ্গী খোঁজার প্রথা

মোঃ নাজমুল ইসলাম (মিলন) দিনাজপুর প্রতিনিধি।

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১১:৩১ এএম

দিনাজপুরে ঐতিহ্যবাহী বউমেলা এখন মিলনমেলা, বদলে গেছে জীবনসঙ্গী খোঁজার প্রথা

ছবিঃ সংগৃহীত

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সাঁওতাল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ‘বউমেলা’ এখন রূপ নিয়েছে মিলনমেলায়। একসময় এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল তরুণ-তরুণীদের জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়া। তবে সময়ের পরিবর্তন, শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তনে সেই প্রথা এখন আর প্রচলিত নেই বললেই চলে। পুরোনো ঐতিহ্যের নামটি টিকে থাকলেও মেলাটি এখন আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও বিভিন্ন এলাকার মানুষের মিলন, আনন্দ এবং সাংস্কৃতিক উৎসবের উপলক্ষে পরিণত হয়েছে।

প্রতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরদিন বীরগঞ্জের বাসিয়াহাটিতে বসে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা। নির্দিষ্ট কোনো প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এ আয়োজন। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এবারের মেলা। সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সী মানুষের আগমন শুরু হয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভিড়। বিকেল ৩টার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেলার মূল আয়োজন জমে ওঠে।

মেলায় সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী সাজে অংশ নেন। তাঁদের রঙিন পোশাক, বাহারি ফুলের সাজ, হাসি-আনন্দ এবং পারস্পরিক মেলামেশায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের পাশাপাশি হিন্দু, মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতি মেলাটিকে সার্বজনীন উৎসবের আবহ দেয়।

জীবনসঙ্গী খোঁজার মেলা থেকে সামাজিক মিলনোৎসব

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মেলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের সামাজিক ইতিহাস ও লোকজ ঐতিহ্য। একসময় মেলাটি তরুণ-তরুণীদের জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার একটি পরিচিত ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতো। এ কারণেই লোকমুখে এর নাম হয়ে ওঠে ‘বউমেলা’।

তবে বর্তমানে সেই প্রথার পরিবর্তে মেলাটি বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং সাংস্কৃতিক আনন্দ ভাগাভাগির আয়োজন হিসেবে। শিক্ষার প্রসার, জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এসেছে পরিবর্তন।

মেলার আয়োজক আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি যোসেফ হেমরম বলেন, কেউ এই মেলার বয়স দুই শত বছরের বেশি বলে মনে করেন, আবার কেউ বলেন, এটি বহুদিনের পুরোনো আয়োজন। তবে ঠিক কবে মেলার সূচনা হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারেন না।

তিনি বলেন, একসময় জীবনসঙ্গী খোঁজার কারণে মেলাটি ‘বউমেলা’ নামে পরিচিতি পেলেও এখন সেই প্রথা আর আগের মতো নেই। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্ম শিক্ষিত হচ্ছে, সামাজিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং প্রচলিত নিয়মের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আইনকানুন মেনে বিয়ে করছে। ফলে মেলাটি এখন দূরদূরান্তে বসবাস করা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হওয়া এবং আনন্দ ভাগাভাগির উপলক্ষে পরিণত হয়েছে।

রঙিন পোশাক, ফুলের সাজ ও লোকজ সংস্কৃতির সমাহার

মেলার মাঠে সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশুরা আসতে শুরু করেন। কারও সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা, কারও সঙ্গে আত্মীয়স্বজন। তরুণ-তরুণীদের রঙিন পোশাক ও বাহারি ফুলের সাজ মেলার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে। পরিচিতজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, গল্প-আড্ডা এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।

মাঠজুড়ে বসে নানা ধরনের পণ্যের দোকান। সেখানে বিক্রি হয় বাহারি কাচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, লিপস্টিক, কানের দুল, ঝিনুকের মালা, মাটির তৈরি খেলনা এবং গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত দা, কুড়াল, হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন সামগ্রী। পাশাপাশি থাকে বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকান। দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করেন।

মেলার আরেকটি আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী নাচ ও গানের আয়োজন। বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ নাচ-গানে মেতে ওঠেন। তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি, পোশাক ও লোকজ পরিবেশনা নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য তুলে ধরার পাশাপাশি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেও সাঁওতাল সংস্কৃতির পরিচিতি বাড়ায়।

শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে মেলার মাঠে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। দীর্ঘদিন পর দূরের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়া, একসঙ্গে কেনাকাটা করা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে আনন্দঘন।

ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা

মেলার আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা ও নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস বলেন, আগে বিয়ে ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সামাজিক বিধিবিধানের প্রভাব ছিল বেশি। বর্তমানে অনেকেই রাষ্ট্রীয় আইন ও প্রচলিত নিয়ম মেনে বিয়ে করছেন। বউমেলা নিয়ে নানা কথা প্রচলিত থাকলেও এখন আগের মতো জীবনসঙ্গী খোঁজার ঘটনা ঘটে না বললেই চলে।

তিনি বলেন, মেলাকে ঘিরে এখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কেনাকাটা ও পারস্পরিক আনন্দ ভাগাভাগির আয়োজনই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এভাবেই ঐতিহ্যবাহী বউমেলা ধীরে ধীরে মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।

বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী নেতা শীতল মার্ডী বলেন, পূর্বপুরুষেরা এই মেলার প্রচলন করেছিলেন। তাঁদের সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে প্রতিবছর আয়োজন করা হচ্ছে। তবে ঠিক কবে মেলার সূচনা হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। বাপ-দাদার কাছ থেকে শুনে আসছেন, যুগ যুগ ধরে এই মেলা চলে আসছে। তাঁরা পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

নিরাপত্তায় পুলিশ, আনসার ও গ্রামপুলিশ

মেলায় হাজারো মানুষের সমাগম ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থাও রাখা হয়। বীরগঞ্জ থানা পুলিশের নেতৃত্বে আনসার ও গ্রামপুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে মেলা যাতে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হয়, সে বিষয়ে সতর্কতা ছিল।

ঐতিহ্যের নাম থাকলেও বদলেছে সময়ের বাস্তবতা

বীরগঞ্জের এই বউমেলা কেবল একটি বার্ষিক আয়োজন নয়; এটি সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সামাজিক ইতিহাস, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ। সময়ের সঙ্গে জীবনযাত্রা ও সামাজিক রীতিতে পরিবর্তন এলেও পূর্বপুরুষের স্মৃতি বহন করে মেলাটি এখনো টিকে আছে।

একসময় জীবনসঙ্গী খোঁজার জন্য পরিচিত এই মেলা এখন নতুন প্রজন্মের কাছে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হওয়া, নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চা এবং আনন্দ ভাগাভাগির উপলক্ষ। তাই ‘বউমেলা’ নামটি পুরোনো ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে থাকলেও এর বর্তমান পরিচয় মূলত মিলনমেলা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!