ঢাকা শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিতে সাইবার হামলার শঙ্কা, বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১১:১৭ এএম

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিতে সাইবার হামলার শঙ্কা, বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

ছবিঃ সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত হওয়ার পর ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে সাইবার হামলা, তথ্য চুরি এবং ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আশঙ্কা করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বন্ধ রাখা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ওয়েবসাইটটি পুনরায় চালু করতে কাজ করছেন সংস্থাটির তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা।

প্রযুক্তি খাতে পিএইচপি (PHP) একটি বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা। এর পূর্ণরূপ হাইপারটেক্সট প্রি-প্রসেসর (Hypertext Preprocessor)। ওয়েবসাইট, ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন, কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং বিভিন্ন অনলাইন সেবা তৈরিতে এই ভাষা ব্যবহৃত হয়। ফলে পিএইচপির নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো দুর্বলতা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করে সংস্থাটির মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি আগেই আঁচ করতে পেরে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত চালু করতে আইটি টিম কাজ করছে।

পিএইচপির দুর্বলতা যেভাবে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে

সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের মতে, কোনো প্রোগ্রামিং ভাষা বা সফটওয়্যারে নিরাপত্তা দুর্বলতা থাকলে আক্রমণকারীরা সেটিকে কাজে লাগিয়ে অননুমোদিতভাবে সিস্টেমে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারে। দুর্বলতার ধরন, সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যারের সংস্করণ এবং সার্ভারের নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা নির্ধারিত হয়।

অ্যানালাইজেন বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সফটওয়্যার প্রকৌশলী সুমিত সাহা মনে করেন, পিএইচপির নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে গুরুতর সাইবার হামলা চালানো সম্ভব। এ কারণে প্রোগ্রামিং ভাষা ও সফটওয়্যার প্রযুক্তির হালনাগাদ সংস্করণ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সুমিত সাহা বলেন, প্রোগ্রামিং স্ক্রিপ্টের মাধ্যমে কোনো অ্যাপ্লিকেশনের মেমোরির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হলে সেখান থেকে ডেটাবেজ পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। যেকোনো ওয়েবসাইট, ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন বা সফটওয়্যারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর তথ্যভান্ডার বা ডেটাবেজ। সাইবার অপরাধীরা সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়া কিংবা সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। ডেটার নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গেলে পুরো অ্যাপ্লিকেশন আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তিনি আরও জানান, পিএইচপিতে সমস্যা শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত নিরাপত্তা প্যাচ বা সুরক্ষামূলক হালনাগাদ প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব হালনাগাদ যথাসময়ে প্রয়োগ করা জরুরি।

সরকারি ওয়েবসাইট নিয়ে কী বলছে সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি

বাংলাদেশে প্রায় ৩৬ হাজার সরকারি ওয়েবসাইট দেখভাল করে বাংলাদেশ সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি। তবে সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. মো. তৈয়বুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব সরকারি ওয়েবসাইট পিএইচপিভিত্তিক নয়। এ কারণে পিএইচপির বর্তমান নিরাপত্তা দুর্বলতার সরাসরি ঝুঁকি এসব ওয়েবসাইটে নেই বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট পিএইচপিনির্ভর, সেগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তা দুর্বলতা মোকাবিলায় প্রকাশিত সিকিউরিটি প্যাচ বা নিরাপত্তা হালনাগাদ সম্পর্কেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানো হয়েছে।

এদিকে, সরকারি যেসব সিস্টেম তৈরিতে পিএইচপি ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে বাংলাদেশ সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি। সংশ্লিষ্ট সিস্টেমে ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেসব পদক্ষেপ জরুরি

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সফটওয়্যারে নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সফটওয়্যারের নিরাপদ সংস্করণ ব্যবহার, নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগ, সার্ভারের কনফিগারেশন পরীক্ষা এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

বিশেষ করে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইটে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক তথ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ডেটা থাকতে পারে। এসব তথ্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি তথ্য ফাঁস ও আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

তবে পিএইচপিতে নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে পিএইচপিভিত্তিক সব ওয়েবসাইট আক্রান্ত হয়েছে। প্রকৃত ঝুঁকি নির্ভর করে ব্যবহৃত সংস্করণ, সংশ্লিষ্ট দুর্বলতার ধরন, নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগ করা হয়েছে কি না এবং সার্ভারের সামগ্রিক সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর।

ওয়েবসাইট বন্ধ রাখাই কি স্থায়ী সমাধান?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ রাখাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট দুর্বলতা যাচাই, প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার হালনাগাদ, সার্ভার পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণসহ সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

ওয়েবসাইটটি পুনরায় চালুর আগে নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে পিএইচপিনির্ভর অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সিস্টেমের ক্ষেত্রেও নিয়মিত নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং দ্রুত হালনাগাদের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

সব মিলিয়ে, পিএইচপির নিরাপত্তা দুর্বলতা বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট সুরক্ষার গুরুত্ব আবারও সামনে এনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার ঘটনা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবাগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!