ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

menu

যে কারণে বন্ধ হয়েছিল ৩০ ব্যাংকের এটিএম ও অনলাইন সেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম

যে কারণে বন্ধ হয়েছিল ৩০ ব্যাংকের এটিএম ও অনলাইন সেবা

ছবিঃ সংগৃহীত

কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত ৩০টি ব্যাংকের এটিএম, কার্ড, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআরভিত্তিক বিভিন্ন সেবা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে গ্রাহকদের জানানো হয়েছিল, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম মাইগ্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে সাময়িকভাবে এসব সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দাবি, এর পেছনে মূল কারণ ছিল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; বরং কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসি (আইটিসিএল) এবং রাশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কম্পাস প্লাসের মধ্যে ব্যবসায়িক চুক্তি ও বকেয়া অর্থ পরিশোধ নিয়ে জটিলতা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কম্পাস প্লাসের কাছে আইটিসিএলের প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার বকেয়া ছিল। পাওনা পরিশোধ ও চুক্তি নিয়ে বিরোধের জেরে রাশিয়ান প্রতিষ্ঠানটি আইটিসিএলের প্রযুক্তিগত সার্ভিস বন্ধ করে দেয়। এর ফলেই কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল ব্যাংকগুলোর গ্রাহকেরা একযোগে এটিএম, কার্ড ও বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেন সেবা ব্যবহারে সমস্যায় পড়েন।

ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত হস্তক্ষেপ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আইটিসিএল কর্তৃপক্ষকে ডেকে কম্পাস প্লাসের সঙ্গে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর নির্দেশ দেন বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। পরে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমঝোতা হলে মঙ্গলবার রাতেই কিউ-ক্যাশের সেবা পুনরায় চালু করা হয়।

৪ অক্টোবর রাত থেকে হঠাৎ বিপর্যয়

কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের বিভিন্ন সেবা গত ৪ অক্টোবর রাত ৯টার পর থেকে একযোগে বিঘ্নিত হতে শুরু করে। এতে নেটওয়ার্কটির আওতাভুক্ত বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহকেরা এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন, কার্ড দিয়ে পিওএস মেশিনে কেনাকাটা এবং অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন লেনদেনে সমস্যায় পড়েন।

একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে ই-কমার্স, কিউআর এবং এনপিএসবিসংশ্লিষ্ট সেবাও ব্যবহার করা যায়নি। ফলে হঠাৎ করেই বিপাকে পড়েন ব্যাংকের বিপুলসংখ্যক গ্রাহক।

বিশেষ করে এটিএমে গিয়ে টাকা তুলতে না পারা, দোকানে কার্ডের লেনদেন ব্যর্থ হওয়া এবং অনলাইন পেমেন্ট সম্পন্ন না হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

বকেয়া ১৫ লাখ ডলার, সেবা বন্ধের দাবি

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইটিসিএল দেশের ৩৩টি ব্যাংককে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও এটিএম-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সেবা দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর পাশাপাশি রাশিয়ার কম্পাস প্লাসের প্রযুক্তি ও সেবার ওপর নির্ভরশীল।

ওই কর্মকর্তার দাবি, কিউ-ক্যাশের সেবা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সিস্টেম মাইগ্রেশনের বিষয়টি সরাসরি সম্পর্কিত নয়। বরং কম্পাস প্লাসের সঙ্গে আইটিসিএলের চুক্তি এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধ নিয়ে বিরোধের কারণেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কম্পাস প্লাস আইটিসিএলের কাছে প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার পাওনা দাবি করে আসছিল। অর্থ পরিশোধ ও চুক্তিসংক্রান্ত জটিলতার সমাধান না হওয়ায় রাশিয়ান প্রতিষ্ঠানটি আইটিসিএলের সার্ভিস বন্ধ করে দেয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কে।

তবে আইটিসিএল বা কম্পাস প্লাসের পক্ষ থেকে এই বক্তব্যের বিষয়ে পৃথক কোনো মন্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা যেতে পারে।

কোন কোন ব্যাংকের গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েন

কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় অগ্রণী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক ব্যাংক, ব্যাংক আলফালাহ, কমিউনিটি ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও উরি ব্যাংক বাংলাদেশের গ্রাহকেরা সমস্যায় পড়েন।

এসব ব্যাংকের সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের কেউ এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারেননি, কেউ পিওএসে কার্ড ব্যবহার করতে পারেননি। অনলাইন কেনাকাটা ও বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেনেও ব্যর্থতার মুখে পড়তে হয় অনেককে।

গ্রাহকদের জানানো হয়েছিল ‘সিস্টেম আপগ্রেড’

সেবা বন্ধের পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অনেকেই গ্রাহকদের এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়েছিল, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম মাইগ্রেশন অথবা রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু ব্যাংকিং সেবা বন্ধ থাকবে।

স্বাভাবিকভাবেই গ্রাহকেরা এটিকে নিয়মিত প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের ওই কর্মকর্তার বক্তব্যে ভিন্ন একটি কারণ সামনে আসে।

তার দাবি, মূল সমস্যা ছিল আইটিসিএল ও কম্পাস প্লাসের মধ্যকার ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিরোধ।

এতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা সিস্টেম মাইগ্রেশনের কথা জানিয়ে গ্রাহকদের কাছে সেবা বন্ধের প্রকৃত কারণ পুরোপুরি স্পষ্ট করা হয়েছিল কি না—সেটি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত হস্তক্ষেপ

সেবা বন্ধের বিষয়টি নজরে আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী আইটিসিএল কর্তৃপক্ষকে ডেকে পাঠায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আইটিসিএল কর্তৃপক্ষকে কম্পাস প্লাসের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধান করে সেবা সচল করার নির্দেশ দেন বলে ওই কর্মকর্তা জানান।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও কম্পাস প্লাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎপরতায় আইটিসিএল ও রাশিয়ান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে সমঝোতা হয় বলে জানানো হয়েছে।

এরপর মঙ্গলবার রাতেই কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সেবা পুনরায় চালু করা হয়।

বুধবার থেকে স্বাভাবিক হতে শুরু সেবা

সমঝোতার পর বুধবার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর এটিএম, কার্ড, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআর-সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

ব্যাংক এশিয়াসহ কয়েকটি ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের এসএমএসের মাধ্যমে সেবা পুনরায় চালুর বিষয়টি জানায়।

অর্থাৎ ৪ অক্টোবর রাত থেকে যে ভোগান্তি শুরু হয়েছিল, বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে তা দ্রুতই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।

সব ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা বন্ধ ছিল না

কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কে সমস্যার কারণে কয়েকটি ব্যাংকের নির্দিষ্ট সেবা বিঘ্নিত হলেও দেশের সব ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এনপিএসবির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং অন্যান্য পেমেন্ট ব্যবস্থা সচল ছিল। একইভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত বিএসিপিএস, বিইএফটিএন ও আরটিজিএস কার্যক্রমও চালু ছিল।

ফলে এটি ছিল মূলত কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্ক এবং এর ওপর নির্ভরশীল ব্যাংকগুলোর নির্দিষ্ট সেবা ঘিরে তৈরি হওয়া একটি সংকট।

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ে তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরতার প্রশ্ন

কিউ-ক্যাশের সাম্প্রতিক ঘটনাটি দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো পরিচালনায় তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরতার বিষয়টিকেও সামনে এনেছে।

কোনো একটি প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বা অর্থ পরিশোধ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তার প্রভাব যদি একসঙ্গে বহু ব্যাংকের এটিএম, কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেনে পড়ে, তাহলে সেটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক বিরোধ থাকে না; বরং তা গ্রাহকসেবা ও আর্থিক লেনদেনের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও জড়িত হয়ে পড়ে।

এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ পেমেন্ট অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা, ব্যাকআপ সিস্টেম, সেবা-নিরবচ্ছিন্নতা এবং তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি নির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

গ্রাহকদের জন্য যে প্রশ্নগুলো রয়ে গেল

বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে দ্রুত কিউ-ক্যাশ সেবা চালু হলেও পুরো ঘটনার স্বচ্ছতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকে গেছে।

প্রথমত, যদি মূল কারণ বকেয়া অর্থ ও চুক্তিসংক্রান্ত বিরোধ হয়ে থাকে, তাহলে গ্রাহকদের কেন মূলত ‘সিস্টেম মাইগ্রেশন’, ‘প্রযুক্তিগত উন্নয়ন’ বা ‘রক্ষণাবেক্ষণ’-এর কথা জানানো হয়েছিল?

দ্বিতীয়ত, একটি বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত বিরোধ কীভাবে একই সময়ে ৩০টি ব্যাংকের গ্রাহকসেবায় প্রভাব ফেলতে পারে?

তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে কোনো একক প্রযুক্তি সরবরাহকারী বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের কারণে পুরো একটি ব্যাংকিং নেটওয়ার্ককে ঝুঁকির মুখে না ফেলে, সে জন্য কী ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে?

এ ঘটনাটি দ্রুত সমাধান হলেও এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া গেলে ব্যাংকিং খাতের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে গ্রাহকদের আস্থা আরও বাড়তে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!