ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

menu

বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০৯:৪৬ এএম

বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার সম্ভাবনাকে ঘিরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে বিশ্বের তিন প্রভাবশালী দেশ—রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার সহযোগিতায় পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাবনা সামনে রেখে চীন প্রস্তাব দিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ।

তিন দেশের উদ্যোগের ধরন ও লক্ষ্য এক নয়। রাশিয়া ইতোমধ্যে বড় আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। চীন প্রস্তাব দিয়েছে ছোট আকারের পারমাণবিক চুল্লি বা স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর (এসএমআর) প্রযুক্তি ব্যবহারের। আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বেসামরিক পরমাণু খাতে সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাবনা, পারমাণবিক প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজার এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক—এসব কারণে দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা, প্রকল্প ব্যয়, ঋণের শর্ত, জ্বালানি সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিনির্ভরতার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

রূপপুরে রাশিয়ার ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প

বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে কেন্দ্রটির মোট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ৯০ শতাংশ অর্থায়নের জন্য রাশিয়া ঋণের ব্যবস্থা করেছে। ফলে প্রকল্পটির নির্মাণ ও অর্থায়ন—উভয় ক্ষেত্রেই রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

রূপপুর চালু হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির অংশ যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বহুমুখী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থনৈতিক গুরুত্ব শুধু নির্মাণ ব্যয়ে সীমাবদ্ধ নয়। একটি কেন্দ্র চালুর পর দীর্ঘ সময় ধরে পারমাণবিক জ্বালানি, বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখতে হয়। ফলে প্রকল্প নির্মাণকারী দেশ বা প্রযুক্তি সরবরাহকারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি হয়।

রূপপুরের ক্ষেত্রেও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত ও জ্বালানিসংক্রান্ত সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের পরিচালনাগত সক্ষমতা বাড়ানো, দেশীয় জনবলকে দক্ষ করে তোলা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চীনের আগ্রহ

রূপপুর প্রকল্পের বাইরে বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে চায় চীন। দেশের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে দেশটি ছোট আকারের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বাগেরহাটের মোংলায় প্রস্তাবিত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাছে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব গত আগস্টে এক যৌথ সভায় তুলে ধরে চীন।

প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সেখানে স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মূলত সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। উৎপাদনের উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করা হলে তা জাতীয় গ্রিডেও যুক্ত হতে পারে।

তবে এটি এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন, অর্থায়ন, প্রযুক্তি নির্বাচন, নিরাপত্তা মূল্যায়ন, নির্মাণ ব্যয় এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই প্রস্তাবটিকে নিশ্চিত নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

চীনের প্রস্তাবের গুরুত্ব হলো, এটি বাংলাদেশের সামনে বড় আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি তুলনামূলক ছোট সক্ষমতার কেন্দ্রের সম্ভাবনাও তুলে ধরছে। তবে প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা থাকলেই কোনো প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বা নিরাপদ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং স্বাধীন নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রয়োজন।

কী এই স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর?

স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর হলো তুলনামূলক ছোট ক্ষমতার পারমাণবিক চুল্লি, যা প্রচলিত বড় আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় কম উৎপাদনক্ষমতার হয়ে থাকে। এর কিছু নকশায় কারখানায় বিভিন্ন মডিউল তৈরি করে প্রকল্পস্থলে নিয়ে স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। তবে সব এসএমআর একই প্রযুক্তি বা নির্মাণপদ্ধতি অনুসরণ করে না।

এসএমআর প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে তুলনামূলক ছোট উৎপাদনক্ষমতা, নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চল বা বিদ্যুতের চাহিদাকেন্দ্রের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ধাপে ধাপে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ। কোনো কোনো নকশায় নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার জন্য বিশেষ প্রযুক্তিও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এসএমআর প্রযুক্তি প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব সমস্যা দূর করে দেয় না। পারমাণবিক নিরাপত্তা, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা—সব ক্ষেত্রেই কঠোর মূল্যায়ন প্রয়োজন।

বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সম্প্রতি জানিয়েছেন, এসএমআর প্রযুক্তি নিয়ে প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে একাধিক দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

তিনি বলেন, এসএমআর প্রযুক্তি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা প্রয়োজন। এই প্রযুক্তির প্রতি বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে, তবে ভালোভাবে বোঝার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, বাংলাদেশ প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা যাচাই করছে। কিন্তু আগ্রহ প্রকাশ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, ব্যয়, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনব্যবস্থা যাচাই করেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতার সমঝোতা

রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগের পাশাপাশি বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সহযোগিতার পথ তৈরি করছে বাংলাদেশ।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের সরকারি সংস্থা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ এবং কোম্পানিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

সমঝোতা স্মারকে দুই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এতে নিজেদের জ্বালানি চাহিদা পূরণে পারমাণবিক শক্তির সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক সেফগার্ডস এবং পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের নীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সমঝোতা অনুযায়ী, দুই দেশেরই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সেফগার্ডস চুক্তি ও অতিরিক্ত প্রটোকল কার্যকর রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ-সংক্রান্ত চুক্তি বা এনপিটির সদস্য।

তবে এই সমঝোতা স্মারককে নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কিংবা পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের চূড়ান্ত চুক্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মূলত বেসামরিক পরমাণু খাতে দুই দেশের সহযোগিতার কাঠামো তৈরির একটি পদক্ষেপ। বাস্তবে কোন কোন ক্ষেত্রে সহযোগিতা হবে, কী ধরনের প্রযুক্তি বা সেবা বিনিময় হবে এবং কোনো প্রকল্প নেওয়া হলে তার অর্থায়ন কীভাবে হবে—এসব বিষয় পৃথক আলোচনা ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের জন্য পারমাণবিক প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা এবং বেসামরিক ব্যবহারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে হলে নির্দিষ্ট চুক্তি, প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে।

কেন বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে আগ্রহ বাড়ছে?

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা, জ্বালানি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বহুমুখী করার প্রয়োজন পারমাণবিক শক্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ার অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক প্রযুক্তির বাজারে বড় দেশগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কূটনৈতিক সম্পর্কও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বড় অঙ্কের প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে কেন্দ্র চালু হওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করা যায়। জ্বালানি সরবরাহ ও পরিচালনব্যবস্থা কার্যকর থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সুযোগও থাকে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকে সব পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সস্তা জ্বালানি বলা যায় না। নির্মাণ ব্যয়, ঋণের সুদ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়, জ্বালানি আমদানি, রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্র বন্ধ করার পরবর্তী ব্যয়—সবকিছু হিসাব করেই প্রকৃত উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করতে হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে আগ্রহের পেছনে আরেকটি বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সম্পর্ক। একটি দেশ থেকে চুল্লি বা প্রযুক্তি গ্রহণের পর বহু বছর ধরে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিশেষজ্ঞ সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের চোখে পরাশক্তিগুলোর আগ্রহ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা, কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রত্যাশা এবং বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন দেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে।

তার মতে, পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সম্পর্কও সহজ হয়। এশিয়ার দেশগুলোতে পারমাণবিক প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট সেবার বাজার রয়েছে, ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে পারমাণবিক বিদ্যুতের ব্যয় বিবেচনার ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ নয়, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনব্যবস্থার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।

অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমতউল্লাহ মনে করেন, পরাশক্তিগুলোর আগ্রহের পেছনে কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। তার মতে, ছোট দেশ হলেও বাংলাদেশের অবস্থান ও সম্ভাব্য বাজারের কারণে দেশটি বড় শক্তিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে আন্তর্জাতিক আগ্রহকে শুধু প্রযুক্তি বা বিদ্যুতের চাহিদার দৃষ্টিতে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থ, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সম্পর্কও রয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো দেশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে সংশ্লিষ্ট চুক্তি, অর্থায়নের শর্ত এবং প্রকল্পের বাস্তব কাঠামো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সামনে কী কী চ্যালেঞ্জ?

পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে একাধিক দেশের আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করলেও এর সঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

প্রথমত, প্রকল্পের অর্থায়ন ও ব্যয়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। ঋণের সুদহার, পরিশোধের মেয়াদ, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং নির্মাণে বিলম্ব হলে অতিরিক্ত ব্যয়—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক নিরাপত্তা। বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা, নির্মাণ, পরিচালনা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করতে হবে। নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক তদারকির কার্যকারিতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, জ্বালানি ও প্রযুক্তিনির্ভরতা। বিদেশি প্রযুক্তিতে নির্মিত কেন্দ্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও বিশেষজ্ঞ সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। তাই একাধিক দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাইয়ের পাশাপাশি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও শর্ত বিশ্লেষণ জরুরি।

চতুর্থত, দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, গবেষণা, নিয়ন্ত্রক দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান প্রয়োজন। দেশীয় জনবলের সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনায় বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা বজায় থাকতে পারে।

পঞ্চমত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত নিরাপত্তা। পারমাণবিক জ্বালানির ব্যবহার শেষে সৃষ্ট বর্জ্য নিরাপদে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রকল্পের পুরো জীবনচক্র বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। আর যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নিলে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও প্রযুক্তিগত দায় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগাতে হবে জাতীয় স্বার্থে

রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার ধরন আলাদা। রাশিয়া রূপপুরে বড় আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে, চীন ছোট আকারের কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতার কাঠামো তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো দেশের প্রস্তাবকে শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বিবেচনায় না দেখে অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা।

একাধিক দেশের সঙ্গে আলোচনা থাকলে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সহযোগিতার শর্ত তুলনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিযোগিতা থেকে সুফল পেতে হলে প্রকল্প মূল্যায়নে স্বচ্ছতা, চুক্তির শর্তে জবাবদিহি এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সবশেষে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাগত দায়িত্ব। রূপপুর প্রকল্পের অভিজ্ঞতা, এসএমআর প্রযুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার কাঠামো—সবকিছুর ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। বিদেশি আগ্রহকে দেশের জন্য টেকসই সুফলে রূপান্তর করা যাবে কি না, তা নির্ভর করবে সঠিক সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছ চুক্তি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!