ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা, নীতি সুদহার অপরিবর্তিত

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম

নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা, নীতি সুদহার অপরিবর্তিত

ছবিঃ সংগৃহীত

মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকি এখনো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে থাকায় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যান্য ডেপুটি গভর্নর, পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় বিদ্যমান নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়ন হলো, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি এলেও তা দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে এই মুহূর্তে মুদ্রানীতি আরও শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।

কেন নীতি সুদহার অপরিবর্তিত

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে এখনো একাধিক ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া, হরমুজ প্রণালীতে সম্ভাব্য অচলাবস্থা, দেশে নিয়ন্ত্রিত জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতিকে আবারও বাড়িয়ে দিতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশঙ্কা, এসব ঝুঁকি পুরোপুরি মূল্যায়নের আগেই যদি মুদ্রানীতি শিথিল করা হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হতে পারে।

এ কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা চাপ থাকলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে আপাতত নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রবৃদ্ধির গতি এখনো দুর্বল

মুদ্রানীতির পর্যালোচনায় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে।

তবে একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। ওই সময়ে শিল্প উৎপাদনও ০ দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।

অর্থাৎ একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এই দুই ধরনের চাপের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

বন্ধ কারখানা চালুতে ২০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে মুদ্রানীতির পাশাপাশি বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিলসহ বিভিন্ন খাতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প বা সিএমএসএমই এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, শুধু মুদ্রানীতি ব্যবহার করে অর্থনীতির সরবরাহসংক্রান্ত সব বাধা দূর করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি অবকাঠামো, জ্বালানি, ব্যবসায়িক পরিবেশ ও অন্যান্য কাঠামোগত ক্ষেত্রে সংস্কার প্রয়োজন।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪.৭৫ শতাংশ

সুদহার কমানোর পর আর্থিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা এখনো দুর্বল রয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

গত ২ আগস্ট থেকে নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হয়েছিল। এর পর আন্তঃব্যাংক সুদহার এবং সরকারি সিকিউরিটিজের ইল্ডও কিছুটা কমেছে।

তবে সুদহার কমার পরও বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণ বিতরণে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে এর পেছনে বিনিয়োগে মন্থরতা, ঋণগ্রহীতাদের উচ্চ ঝুঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার মতো বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের বড় ঝুঁকি

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন বিনিয়োগে অর্থায়ন নিয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন পুনরুদ্ধার এবং ঋণ বিতরণে শৃঙ্খলা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিতে, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে শুধু সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

রেমিট্যান্সে বড় স্বস্তি

বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্টসে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল।

তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মূলত আর্থিক হিসাবের ঘাটতিই এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

এর মধ্যেও রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রথম দুই মাসে রেমিট্যান্স ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। এতে বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি বিনিময় হার মোটামুটি স্থিতিশীল থাকায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলেছে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির সামনে যেসব ঝুঁকি

অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বেশ কয়েকটি বহুমুখী ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব, হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাব।

দেশীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব খাতে চাপ, নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিশেষ করে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তা উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যায়—এটাই বর্তমান মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্য।

এ জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতি, দেশের মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি, ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ, বৈদেশিক লেনদেন, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে নতুন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মুদ্রানীতির অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে। আপাতত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নীতি সুদহার বহাল রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার পথেই থাকছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!