ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বাড়াতে ১৮ বাজারে নতুন কৌশল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বাড়াতে ১৮ বাজারে নতুন কৌশল

ছবিঃ সংগৃহীত

তৈরি পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে দেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে পণ্য ও বাজার—উভয় ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনার সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার। বিশ্বের ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক গন্তব্যের বাজার সম্ভাবনা, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা, প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাত বিশ্লেষণ করে পৃথক বাজারভিত্তিক রপ্তানি কৌশল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সোমবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ডাইভার্সিফিকেশন স্ট্র্যাটেজি: প্রোডাক্ট অ্যান্ড মার্কেট ডাইভার্সিফিকেশন অ্যাক্রস ১৮ কি ট্রেডিং ডেস্টিনেশনস’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব তথ্য জানান বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন তিনি।

বাণিজ্য সচিব বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী, বহুমুখী ও টেকসই করতে শুধু নতুন পণ্য তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদ্যমান বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। এ কারণে নির্বাচিত ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্যের জন্য পৃথকভাবে বাজারভিত্তিক বিশ্লেষণ ও কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

১৮ বাজারের জন্য পৃথক রপ্তানি কৌশল

মো. আতাউর রহমান খান বলেন, বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উইংয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা, সম্ভাবনাময় বাংলাদেশি পণ্য এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

এসব তথ্য একত্র করে প্রতিটি দেশের জন্য পৃথক দেশভিত্তিক প্রোফাইল তৈরি করা হবে। একই সঙ্গে ওই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য কী ধরনের নীতিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ প্রয়োজন, সেটিও নির্ধারণ করা হবে।

বাণিজ্য সচিব জানান, বাজার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ম্যাট্রিক্স অনুসরণ করা হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির অংশ, নির্দিষ্ট পণ্যে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ, প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান এবং সক্ষমতা বাড়ানোর উপায় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে এবং সেগুলো দূর করতে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের নীতি সহায়তা প্রয়োজন, তাও বিশ্লেষণের আওতায় রাখা হয়েছে।

শুধু পোশাক নয়, নতুন পণ্যের সন্ধান

বাণিজ্য সচিব বলেন, ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বাজারের বিশদ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় নতুন পণ্য চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি যেসব পণ্য ইতোমধ্যে রপ্তানি হচ্ছে, সেগুলোর নতুন বাজার সৃষ্টি এবং বিদ্যমান বাজারে রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগও খুঁজে বের করা হবে।

এর ফলে তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছে সরকার।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদন সক্ষমতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, বাজার সম্পর্কে তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট দেশের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি কর্মশালায় উঠে আসে।

সেবা রপ্তানিতেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

কর্মশালায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে পণ্যের পাশাপাশি সেবা খাতকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের পরিকল্পনায় শুধু পণ্য রপ্তানির দিকে নজর দিলে হবে না। তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি এবং সক্ষমতাবর্ধক বিভিন্ন সেবা খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যেতে হবে।

এ ক্ষেত্রে ফ্রিল্যান্সারদের বিকাশ ও তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের সুযোগ সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রযুক্তি ব্যবহারে জোর

ড. মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে উৎপাদন ও সেবা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো প্রয়োজন। প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ধরনের পণ্য ও সেবা তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি ভৌগোলিক নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবা রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদারের কথাও বলেন।

বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিদের প্রস্তাব

কর্মশালায় তৈরি পোশাক শিল্পের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতের প্রতিনিধিরা রপ্তানি সম্প্রসারণে নিজেদের মতামত ও প্রস্তাব তুলে ধরেন।

বিজিএমইএ, ফ্লেক্সা, সিপিডি, ওয়ালটন গ্রুপ, বাংলাদেশ এগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন এবং ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের প্রতিনিধিরা কর্মশালায় অংশ নেন। এ ছাড়া বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনায় তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিভিন্ন সেবা খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে।

রপ্তানি কাঠামোকে বহুমুখী করার লক্ষ্য

সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় বাড়াতে হলে নির্দিষ্ট একটি বা কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বহুমুখী রপ্তানি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন বাজার তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক গন্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রস্তাবিত বাজারভিত্তিক কৌশল বাস্তবায়িত হলে নতুন পণ্য ও নতুন বাজার চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিদ্যমান রপ্তানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হিসেবে তাই একদিকে নতুন পণ্য ও সেবা আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরা, অন্যদিকে নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদ্যমান বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়টিই গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং একটি বহুমুখী ও টেকসই রপ্তানি কাঠামো গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে বলে কর্মশালায় সংশ্লিষ্টরা মত দেন।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!