ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

সাংবাদিক গ্রেপ্তারে আগে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব, সাইবার সুরক্ষা আইনে সেভিং ক্লজ

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম

সাংবাদিক গ্রেপ্তারে আগে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব, সাইবার সুরক্ষা আইনে সেভিং ক্লজ

ছবিঃ সংগৃহীত

সাংবাদিকদের অন্যায়ভাবে হয়রানি ও ভিকটিমাইজেশন ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় সাংবাদিক গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি তিনি নিজেও উপযুক্ত মনে করেছেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে যেন আইনের অপপ্রয়োগের শিকার হতে না হয়, সে জন্য খসড়ায় বিশেষ সুরক্ষা বা ‘সেভিং ক্লজ’ যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

 

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আদালতের অনুমতি নেওয়ার যে প্রস্তাব এসেছে, সেটি আলোচনায় গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছ থেকে আরও মতামত নিয়ে সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে।

নিপীড়নমূলক আইন না করার লক্ষ্য

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট সংশোধনের জন্য যে খসড়া তৈরি করা হয়েছিল, তা মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রিসভার আলোচনার পর সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা করার সিদ্ধান্ত হয়।

বিশেষ করে সাইবার স্পেসে কাজ করা ব্যক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের মতামত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনটি যাতে কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক আইনে পরিণত না হয়, সে জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে খসড়া বিলটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার সংগঠন, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও শিক্ষার্থীরাও মতামত দিয়েছেন।

এসব মতামত সংগ্রহ ও সমন্বয় করে সংশোধনী প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সাংবাদিকদের সুরক্ষায় ‘সেভিং ক্লজ’

বৈঠকে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের আইনের অপপ্রয়োগ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মাহফুজ আনাম প্রস্তাব করেছেন—মিডিয়া ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে আরও সময় নিয়ে মতামত নেওয়া এবং গণমাধ্যম যাতে আইনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা ভিকটিমাইজড না হয়, সে জন্য বিশেষ সুরক্ষা বা ‘সেভিং ক্লজ’ রাখার ব্যবস্থা করা।

তিনি জানান, এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারও মনে করে সবার মতামত ও আলোচনার মধ্য দিয়ে আইনটি আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে আইনটি করা হচ্ছে না এবং কোনো সাংবাদিক যাতে এই আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হন, সেটিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।

গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব

সাংবাদিকদের জন্য প্রস্তাবিত সুরক্ষার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবাদপত্র, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং অনলাইন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা যাতে অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য একটি প্রস্তাব এসেছে।

সেটি হলো—কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতি নেওয়া।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা এই প্রস্তাবকে উপযুক্ত মনে করেছেন। তবে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছ থেকে আরও সুপারিশ পাওয়ার পর বিষয়টি চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা হবে।

অর্থাৎ, বর্তমানে এটি খসড়া পর্যায়ের একটি প্রস্তাব। আইন চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এর কাঠামো বা প্রয়োগের ধরন পরিবর্তিত হতে পারে।

আপিল নিষ্পত্তিতে সময়সীমার প্রস্তাব

সাইবার সুরক্ষা আইনের আওতায় কোনো বিষয়ে আপিল হলে তা যেন দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে না থাকে, সে বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আপিল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো—কোনো ব্যক্তি যাতে অনির্দিষ্টকাল ধরে আইনি প্রক্রিয়ায় ঝুলে না থাকেন।

এ ছাড়া সংশোধনী খসড়ার বিভিন্ন বিষয়ে গণমাধ্যম ও অন্যান্য অংশীজনের কাছ থেকে আরও পরামর্শ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

গণমাধ্যম ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি

সংশোধনী প্রক্রিয়ায় মতামত সংগ্রহ ও সমন্বয়ের জন্য তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা বা পিআইওকে ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সমন্বয় করবে। এতে সংবাদপত্রের সম্পাদক পরিষদের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংগঠনের প্রতিনিধিরাও থাকবেন।

এ ছাড়া সাইবার সিকিউরিটি ও সাইবার প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠনের কথা রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এ প্যানেল গঠনের কাজ করবে।

৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আগামী ৭ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছ থেকে সুপারিশ পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

সুপারিশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কমিটির সদস্যদের নিয়ে আবার বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরপর মন্ত্রিসভায় পাঠানোর আগে সংশোধিত খসড়াটি আবারও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

ওয়েবসাইটে প্রকাশের পরও জনগণ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে জানান তিনি।

সংসদেও হবে আলোচনা

সংশোধিত আইন সংসদে গেলেও তাড়াহুড়ো করে পাস করা হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, সংসদে আইনটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা তাদের মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে সংসদের বাইরেও বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা থেকে মতামত নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

সব পক্ষের মতামত বিবেচনা করে এমন একটি আইন প্রণয়ন করতে চান তারা, যার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।

বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজকে সাইবার জগতের বিভিন্ন ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও আইনের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

খসড়া আইনে এখনো পরিবর্তনের সুযোগ

সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ নিয়ে সরকারের এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে খসড়া আইনটি এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে বৈঠকের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতি, গণমাধ্যমের জন্য সেভিং ক্লজ, আপিল নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব এখনো আলোচনা ও মতামত গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।

আগামী দিনে গণমাধ্যম, সাইবার বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন, প্রযুক্তিবিদ, আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নিয়ে খসড়ায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এরপর সংশোধিত খসড়া মন্ত্রিসভা হয়ে সংসদে গেলে আইনটির চূড়ান্ত রূপ নির্ধারিত হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!