বগুড়ায় জেলা ও দায়রা জজ পদে নতুন বিচারক পদায়নকে কেন্দ্র করে আদালতপাড়ায় উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। সরকারি আদেশ অনুযায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত জেলা জজের দায়িত্ব গ্রহণে বাধা সৃষ্টি এবং আদালত বর্জনের কর্মসূচি ঘিরে আইনজীবীদের মধ্যে মতবিরোধ, তর্ক-বিতর্ক ও ধস্তাধস্তির অভিযোগ উঠেছে। এতে আদালতের স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় বগুড়া আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল বাছেদ এবং তার অনুসারী আইনজীবীদের বিরুদ্ধে সরকারি আদেশ অমান্য ও আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছেন অ্যাডভোকেট আব্দুল ওহাব। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পিপি আব্দুল বাছেদ। তার দাবি, আদালত সচল রাখতেই তিনি দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন এবং আদালত বর্জনের সিদ্ধান্তটি বার সমিতির।
অন্যদিকে বগুড়া বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, পদায়নকৃত জেলা ও দায়রা জজকে নিয়ে আইনজীবীদের আপত্তি রয়েছে এবং তাকে বগুড়া থেকে না সরানো পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
সরকারি আদেশ ঘিরে বিরোধ
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জেলা জজ পদায়নকে কেন্দ্র করে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরেন অ্যাডভোকেট আব্দুল ওহাব।
তিনি বলেন, বগুড়ায় তিন মাসেরও বেশি সময় জেলা ও দায়রা জজের পদ শূন্য ছিল। এ সময়ে ভারপ্রাপ্ত জেলা জজের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও এতে বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে সরকার ১৭ সেপ্টেম্বর সরকারি আদেশের (জিও) মাধ্যমে একজন জেলা ও দায়রা জজ পদায়ন করে। কিন্তু ওই বিচারক দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আব্দুল ওহাব।
তার দাবি, সরকারি আদেশ জারির পর বগুড়া বার সমিতির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজন আইনজীবী সংবাদ সম্মেলন করে আদালত বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বার সমিতির নির্বাহী কমিটি কিংবা সাধারণ সভায় যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে এ ধরনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে তা সমিতির সাংগঠনিক বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
দায়িত্ব গ্রহণে বাধার অভিযোগ
আব্দুল ওহাবের অভিযোগ, পিপি অ্যাডভোকেট আব্দুল বাছেদসহ তাদের অনুসারী আইনজীবীরা সরকারি আদেশে পদায়ন পাওয়া নতুন জেলা জজের দায়িত্ব গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছেন। যদিও সংশ্লিষ্ট পক্ষ এ ধরনের বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকারি আদেশের পক্ষে অবস্থান নেওয়া আইনজীবীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
আব্দুল ওহাব বলেন, কোনো সরকারি আদেশ বা প্রজ্ঞাপন নিয়ে আপত্তি থাকলে তা আইনসম্মত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতিতে উত্থাপন করা যেতে পারে। কিন্তু সরকারি আদেশ বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে আদালতের কার্যক্রম ব্যাহত করা হলে এর প্রভাব সরাসরি বিচারপ্রার্থীদের ওপর পড়ে।
তার ভাষ্য, আইনজীবীরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত। তাই তাদের কাছ থেকেই আইন ও বিধিবিধানের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত।
আদালত বর্জন নিয়ে মতবিরোধ
আব্দুল ওহাবের দাবি, জেলা জজ পদায়নকে কেন্দ্র করে আদালত বর্জনের কর্মসূচির কারণে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আদালতে আসা বিচারপ্রার্থী, মামলার সাক্ষী ও স্বজনদের দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন জেলা ও দায়রা জজের পদ শূন্য থাকার পর নতুন বিচারক পদায়নের মাধ্যমে যে সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি কোনোভাবেই নতুন জটিলতার কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
তার মতে, আদালতের পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা শুধু বিচারকদের দায়িত্ব নয়; আইনজীবী, আদালত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার পিপির
তবে সরকারি আদেশ অমান্য, নতুন জেলা জজের দায়িত্ব গ্রহণে বাধা এবং আদালত বর্জনের কর্মসূচিতে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বগুড়া আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্দুল বাছেদ।
তিনি বলেন, আদালত সচল রাখতে তিনি দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন। আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি বগুড়া বার সমিতির সিদ্ধান্ত।
অর্থাৎ, তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি আদেশ অমান্য বা বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ করার উদ্দেশ্যে তিনি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না; বরং চলমান বিরোধের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন।
‘জেলা জজকে সরানো পর্যন্ত আন্দোলন’
বগুড়া বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, পদায়নকৃত জেলা ও দায়রা জজকে নিয়ে আইনজীবীদের আপত্তি রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী আন্দোলনের মুখে ওই বিচারক বগুড়া থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, “পদায়নকৃত জেলা ও দায়রা জজকে ফ্যাসিবাদের দোসর বলে আইনজীবীরা আখ্যায়িত করেন। ৫ আগস্ট পরবর্তী আন্দোলনের মুখে তিনি বগুড়া থেকে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বগুড়া থেকে তাকে না সরানো পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এটাই বার সমিতির সিদ্ধান্ত।”
এ বক্তব্যে ব্যবহৃত ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ শব্দবন্ধটি বার সমিতির সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য হিসেবে এসেছে; এটি প্রতিবেদনের নিজস্ব মূল্যায়ন নয়।
বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির আশঙ্কা
জেলা ও দায়রা জজের পদ দীর্ঘ সময় শূন্য থাকার পর নতুন করে পদায়ন হলেও দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আইনজীবীদের একাংশ সরকারি আদেশ বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নিলেও অন্য একটি অংশ পদায়নকৃত বিচারককে নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আন্দোলন করছে। ফলে আদালতপাড়ায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
তর্ক-বিতর্ক ও ধস্তাধস্তির মতো ঘটনা ঘটলে শুধু আইনজীবীদের মধ্যকার বিরোধই বাড়ে না, আদালতের স্বাভাবিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিচারপ্রার্থীদের ওপর।
বিশেষ করে যেসব মামলায় ধার্য তারিখ, সাক্ষ্যগ্রহণ, জামিন, শুনানি বা অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রম রয়েছে, আদালত বর্জন বা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে সেসব মামলার পক্ষগুলোকে নতুন তারিখের জন্য অপেক্ষা করতে হতে পারে।
প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানের আহ্বান
আব্দুল ওহাব আদালতপাড়ার চলমান পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, সরকারি আদেশ নিয়ে কোনো পক্ষের আপত্তি থাকলে সেটি যথাযথ আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় উত্থাপন করা উচিত।
তিনি বগুড়া বার সমিতির ঐতিহ্য ও সুনাম রক্ষায় আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সরকারি সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে বার সমিতিকে আরও আধুনিক ও সমৃদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে বার সমিতির পক্ষ থেকে পদায়নকৃত জেলা ও দায়রা জজকে নিয়ে আপত্তি অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।
ফলে এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—সরকারি আদেশ অনুযায়ী পদায়ন করা বিচারক দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন কি না এবং আইনজীবীদের চলমান বিরোধ কীভাবে মীমাংসা হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে পক্ষেরই অবস্থান হোক, আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম যাতে দীর্ঘ সময় ব্যাহত না হয় এবং বিচারপ্রার্থীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।

