মাঠপর্যায়ে ভ্যাট ও রাজস্ব আদায়ে গতিশীলতা আনা এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক করার লক্ষ্যে ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সংশোধিত ব্যবস্থায় প্রতি কর মেয়াদ শেষে ভ্যাট রিটার্ন জমার সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান এবং জিরো রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত নিয়মিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
একই বৈঠকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। মন্ত্রিসভা বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণকে ‘ঐতিহাসিক ও মর্যাদাপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিনিধিদলকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানিয়েছে।
প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমার নিয়ম
বৈঠক-সংশ্লিষ্ট অর্থ ও রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা আনতে ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২’-এর ধারা ৬৪ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়।
সংশোধিত বিধানে আগের নিয়ম পরিবর্তন করে প্রতি কর মেয়াদের জন্য ভ্যাট দাখিলপত্র বা রিটার্ন জমার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসের কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অনধিক ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হবে।
আগের ব্যবস্থায় প্রতি তিন কর মেয়াদ সমাপ্তির পর অনধিক ১৫ দিনের মধ্যে দাখিলপত্র জমা দেওয়ার যে বিধান ছিল, সংশোধনীর মাধ্যমে তা পরিবর্তন করা হচ্ছে।
সরকারি ছুটি থাকলে পরবর্তী কার্যদিবসে রিটার্ন
নতুন নিয়মে কোনো মাসের ১৫তম দিন সরকারি ছুটির দিন হলে রিটার্ন জমা দেওয়ার জন্য পরবর্তী প্রথম কার্যদিবস পর্যন্ত সময় পাওয়া যাবে।
এর ফলে নির্ধারিত সময়ের শেষ দিন সরকারি ছুটির কারণে রিটার্ন জমা দিতে না পারার ক্ষেত্রে করদাতা বা প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত কোনো জটিলতার মুখে পড়তে হবে না।
তবে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ও রিটার্নদাতার জন্য সাধারণ ১৫ দিনের পরিবর্তে ২০ দিনের সময়সীমা রাখা হয়েছে।
যাদের জন্য ২০ দিন সময়
সংশোধিত ব্যবস্থায় সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান এবং জিরো রিটার্ন দাখিলকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অনধিক ২০ দিনের মধ্যে ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে পারবে।
অর্থাৎ সাধারণ করদাতাদের ক্ষেত্রে ১৫ দিনের সময়সীমা থাকলেও নির্দিষ্ট শ্রেণির রিটার্নদাতাদের জন্য অতিরিক্ত পাঁচ দিনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
রাজস্ব বিভাগের সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানভেদে হিসাব সংরক্ষণ ও আর্থিক তথ্য প্রস্তুতের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই অতিরিক্ত সময়ের বিধান রাখা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে রাজস্ব আদায়ে গুরুত্ব
ভ্যাট বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ব্যবসা ও সেবাখাতের বিস্তারের সঙ্গে ভ্যাটের আওতা বাড়লেও মাঠপর্যায়ে রিটার্ন দাখিল, তথ্য সংগ্রহ, করদাতার হিসাব যাচাই এবং রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সংশোধিত বিধানের মাধ্যমে নিয়মিত রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করা এবং কর প্রশাসনের কাছে ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ডের তথ্য আরও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রতি মাসে রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের ফলে করদাতার লেনদেন ও ভ্যাট-সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমও আরও গতিশীল করার লক্ষ্য রয়েছে।
জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রশংসা
মন্ত্রিসভা বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফরের অর্জন ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়। মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে বলা হয়, জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বিশ্বমঞ্চে সরকারের অঙ্গীকার ও নতুন প্রত্যাশাগুলো তুলে ধরেছে।
মন্ত্রিসভা মনে করে, সফরের মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিনিধিদলকে অভিনন্দন
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে মন্ত্রিসভা ‘ঐতিহাসিক ও মর্যাদাপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এ জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানানো হয়।
বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বার্থ ও অঙ্গীকার তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
রাজস্ব ও কূটনীতিতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
একই মন্ত্রিসভা বৈঠকে একদিকে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়মে পরিবর্তন এনে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের মূল্যায়ন করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
ভ্যাট অধ্যাদেশের সংশোধন বাস্তবায়িত হলে সাধারণ করদাতাদের প্রতি কর মেয়াদ শেষে ১৫ দিনের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জিরো রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য থাকবে ২০ দিনের সময়সীমা।
মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অধ্যাদেশটি কার্যকর করার পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

