ভ্যাটের আওতা বাড়াতে চলতি অর্থবছরে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব খোলা ও ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। নতুন এই শর্তকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের মধ্যে চাপ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বাস্তবতা বিবেচনায় বিআইএন সংক্রান্ত শর্ত শিথিল বা বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, এটি তাদের নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বিদ্যমান আইনের বাধ্যবাধকতার কারণেই ব্যাংক হিসাব ও ঋণের ক্ষেত্রে বিআইএন প্রমাণপত্র প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে এবিবির দাবিতে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
এনবিআরের অবস্থান হলো, ক্ষুদ্র, মাঝারি কিংবা বড়—সব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য একই আইন প্রযোজ্য হবে। বিআইএন নিবন্ধন বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিক কর কাঠামোর আওতায় আনা এবং ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারণই এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য।
এবিবির তিন দফা দাবি
বিআইএন বাধ্যতামূলক করার ফলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংক হিসাব খোলা এবং ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে—এমন দাবি করে গত ১৭ আগস্ট এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় এবিবি।
সংগঠনটির দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংক হিসাব খোলা এবং ঋণ বা ক্রেডিট সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিআইএন নিবন্ধনের প্রমাণ দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া।
এ ছাড়া সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা বা বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত সিএমএসএমই গ্রাহকদের বিআইএন দাখিলের সময়সীমা যুক্তিসংগতভাবে বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে বিআইএন আনুষ্ঠানিকীকরণের সুযোগ দেওয়ারও প্রস্তাব করেছে ব্যাংকারদের সংগঠনটি।
এবিবির মতে, ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসায়িক নিবন্ধনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে বিআইএন নিবন্ধনের সুযোগ রাখা যেতে পারে। প্রয়োজনে উদ্যোক্তার বিদ্যমান ব্যাংকিং রেকর্ডকেও সহায়ক প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের জবাব কী
এবিবির চিঠির জবাবে ১৭ সেপ্টেম্বর এনবিআর জানিয়েছে, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৪-এর উপধারা (৩)-এর দফা (ক) ও (খ) অনুযায়ী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা, পরিচালনা এবং ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিআইএন উপস্থাপন বাধ্যতামূলক।
এনবিআরের বক্তব্য অনুযায়ী, যেহেতু বিষয়টি আইনি বাধ্যবাধকতার আওতাভুক্ত, তাই এবিবির প্রস্তাব অনুযায়ী অব্যাহতি দেওয়ার সুযোগ নেই।
রাজস্ব বোর্ড আরও বলেছে, যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগে বিআইএন ছাড়া ব্যাংক হিসাব খুলেছে, তাদের দ্রুত ভ্যাট নিবন্ধন গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। নতুন করে ব্যবসায়িক হিসাব খোলার সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিআইএন যাচাই করাও প্রয়োজন।
কেন বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলো
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ব্যাংক হিসাব খোলার প্রক্রিয়াকে ভ্যাট নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বাজেট পাসের পর অর্থবিলে এ-সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত হয়।
নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট কিংবা শর্ট-টার্ম ডিপোজিট বা এসটিডি হিসাব খোলা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বিআইএন প্রমাণপত্র প্রয়োজন হবে। একইভাবে ব্যবসায়িক ঋণ বা ক্রেডিট সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রেও বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শুধু ব্যাংক হিসাব বা ঋণের ক্ষেত্রেই নয়, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ এবং কোম্পানির নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও বিআইএন প্রয়োজন হবে।
এনবিআরের যুক্তি, এসব সেবার সঙ্গে বিআইএন যুক্ত করা হলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ আনুষ্ঠানিক কর কাঠামোর আওতায় আসবে। এর ফলে ভ্যাট নিবন্ধনের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও আরও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব হবে।
সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর
ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের একটি অংশ মনে করছে, নতুন নিয়মের বাস্তব প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটির উদ্যোক্তাদের ওপর। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই এখনো বিআইএন নেই কিংবা নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
কোনো উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলে কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে ঋণ নিতে গেলে যদি আগে বিআইএন সংগ্রহ করতে হয়, তাহলে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ হতে পারে। বিশেষ করে যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সীমিত জনবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাদের ক্ষেত্রে কাগজপত্র ও নিবন্ধন-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
একজন এসএমই খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী বলেন, বাস্তবতা বিবেচনা না করে হঠাৎ কঠোরভাবে নিয়ম কার্যকর করা হলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যাংকিং সেবা থেকে দূরে সরে যেতে পারেন। তার মতে, পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন, সাময়িক শিথিলতা অথবা বিদ্যমান ব্যাংকিং রেকর্ডকে সহায়ক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ রাখা হলে উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।
ঋণপ্রবাহ নিয়ে ব্যাংকারদের উদ্বেগ
এবিবির মূল উদ্বেগের একটি হলো সিএমএসএমই খাতে ঋণপ্রবাহ। ব্যাংকারদের সংগঠনটির মতে, নতুন হিসাব খোলা বা ঋণ অনুমোদনের আগে বিআইএন বাধ্যতামূলক হওয়ায় যেসব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার এখনো বিআইএন নেই, তারা ব্যাংকিং সেবা নিতে সমস্যায় পড়তে পারেন।
এসএমই খাত দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখায় এ খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেলে তার প্রভাব ব্যবসা, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর পড়তে পারে বলে মনে করছে এবিবি।
অন্যদিকে এনবিআর বলছে, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে স্থায়ীভাবে বিআইএন সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখলে ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
দেশের অর্থনীতিতে সিএমএসএমইর বড় ভূমিকা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। এর প্রায় ৯৯ শতাংশই কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি বা সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান।
আকারভেদে দেশে মাইক্রো প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৬৬ লাখ ৩১ হাজার, কুটির প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪৫ লাখ ৩৩ হাজার, ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪ লাখ ৯২ হাজার এবং মাঝারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩৬ হাজার। বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯ হাজারেরও কম।
এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। বিভিন্ন হিসাবে সিএমএসএমই খাতে ৩ কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে, যা শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ। দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতেও এ খাতের অবদান বিভিন্ন হিসাবে প্রায় ২৫ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যে।
ফলে একদিকে কর ও ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর সরকারি লক্ষ্য এবং অন্যদিকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা ও ঋণপ্রাপ্তির সক্ষমতা—দুই বিষয়কে কীভাবে সমন্বয় করা যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাজস্ব সম্প্রসারণ বনাম ব্যবসার সহজ পরিবেশ
বিআইএন বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়ে সরকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনতে চাইছে। এতে ব্যবসার প্রকৃত পরিধি সম্পর্কে সরকারের কাছে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভ্যাট আদায়ের ভিত্তিও বাড়তে পারে।
তবে উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম বাস্তবায়নের পদ্ধতি, নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সহজতা এবং ব্যাংকিং সেবায় প্রবেশাধিকারও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে রাজস্ব সম্প্রসারণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নিবন্ধন ও আনুষ্ঠানিকতার প্রক্রিয়া কতটা সহজ করা যায়, সেটিও নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে এবিবির ছাড় বা শিথিলতার দাবি নাকচ করে আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে এনবিআর। ফলে বিআইএনবিহীন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন নিয়ম কার্যকর করাই এখন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য নিয়ম বাস্তবায়নে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে এবং একই সঙ্গে কীভাবে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হবে—এই সমন্বয়ের ওপরই নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করবে।

