ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

সরকারের রেকর্ড ব্যাংকঋণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধস

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ৯, ২০২৬, ১০:৪০ এএম

সরকারের রেকর্ড ব্যাংকঋণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে ধস

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের ব্যাংকিং খাতে দেখা দিয়েছে গভীর বৈপরীত্য। একদিকে সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা বাড়ছে দ্রুত, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা, যা এক অর্থবছরে সরকারের নেওয়া সর্বোচ্চ ব্যাংকঋণ। বিপরীতে গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদাই দুর্বল থাকায় সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণকে সরাসরি ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা যাচ্ছে না। তবে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি ফিরলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তখন সরকার যদি একই হারে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে থাকে, বেসরকারি খাতের জন্য অর্থের প্রাপ্যতা কমে গিয়ে ঋণের সুদহার, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ সরকারি ব্যাংকঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা।

অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংকঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুধু তাই নয়, বিদায়ী অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, তা মূল বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা এবং পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে নির্ধারিত সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিচ্ছে।

বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে স্থবিরতা

সরকারের ঋণ গ্রহণ যখন রেকর্ড উচ্চতায়, তখন উল্টো চিত্র বেসরকারি খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। মে মাসে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবেই কমছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। এমনকি করোনাভাইরাস মহামারির সবচেয়ে কঠিন সময়েও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে নামেনি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি ছিল ১৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।

কিন্তু চলতি বছরের জুন শেষে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ছয় মাসে ঋণ বেড়েছে মাত্র প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ২ দশমিক ০৭ শতাংশ।

কেন কমছে বেসরকারি খাতের ঋণ?

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঋণের উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা, ব্যবসার পরিবেশের দুর্বলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমেছে।

অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে। নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা বড় ধরনের সম্প্রসারণে বিনিয়োগের পরিবর্তে উদ্যোক্তাদের একটি অংশ অপেক্ষা ও সতর্কতার নীতি অনুসরণ করছেন।

ফলে ব্যাংকে ঋণের চাহিদা কমেছে। একই সময়ে ব্যাংকগুলোও খেলাপি ঋণ ও তারল্য ব্যবস্থাপনার চাপের মধ্যে রয়েছে।

‘ক্রাউডিং আউট’ ঝুঁকি কোথায়?

অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন সরকার বিপুল পরিমাণে ব্যাংক বা আর্থিক বাজার থেকে ঋণ নেওয়ায় বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের অর্থ সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে ঋণের সুদহার বাড়তে পারে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যাংকঋণকে সরাসরি ক্রাউডিং আউট বলা ঠিক হবে না। কারণ, বেসরকারি খাতে বর্তমানে ঋণের চাহিদাই কম।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের গতি ফিরলে ঋণের চাহিদা বাড়বে। তখনও সরকার যদি ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকে, তাহলে ক্রাউডিং আউটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ পরিস্থিতি এড়াতে রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ কঠিন

বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার বিষয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসার পরিবেশের ঘাটতি, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, ঋণের উচ্চ সুদহার এবং সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ—সব মিলিয়েই বেসরকারি খাতে ঋণ কমছে।

তার মতে, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন। আবার সরকার যদি ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমার আশঙ্কা থাকে।

তিনি বলেন, মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান না করে বড় অঙ্কের প্রণোদনা দিলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে বড় শঙ্কা

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী মনে করেন, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ অর্থনীতিতে ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট তৈরির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

তার মতে, এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমতে পারে এবং ঋণের সুদহার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকতে পারে। এতে নতুন বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব আহরণ দুর্বল হওয়ায় ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

নীতি সুদহার কমিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গতি

বেসরকারি খাতকে চাঙা করতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়েছে। পাশাপাশি আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য—ঋণের ব্যয় কমিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গতি ফিরিয়ে আনা। তবে শুধু সুদহার কমালেই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো, বাজার পরিস্থিতি এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতির সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ

বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আয় বাড়িয়ে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো। অন্যদিকে বেসরকারি খাতকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনতে ঋণের ব্যয় কমানো এবং ব্যবসায়িক আস্থা পুনর্গঠন জরুরি।

অর্থনীতিতে সরকারি ব্যয় ও ঋণের প্রয়োজন থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে অর্থের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। ফলে এখন বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় যে চাপটি দৃশ্যমান নয়, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালে সেটিই বড় ঝুঁকি হিসেবে সামনে আসতে পারে।

একদিকে সরকারের রেকর্ড ব্যাংকঋণ, অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা—এই দুই বিপরীত প্রবণতা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!