নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতির কয়েকটি সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও সামগ্রিকভাবে স্বস্তির চেয়ে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়নে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে দেশের প্রধান তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
সোমবার সকালে সিপিডির আয়োজনে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস : একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। সংলাপে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা নিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছিল, তার বাস্তবায়নে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি কাঠামোগত নানা সমস্যার মধ্যে ছিল। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকার কোনো সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি করেনি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আগের অবস্থার তুলনা করে সরকারের পদক্ষেপ ও অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের সংস্কার কর্মসূচিতেও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সরকার প্রয়োজনীয় সাহস দেখাতে পারছে না। সংস্কার কার্যক্রম দীর্ঘায়িত হলে আগের ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা আবারও প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পেতে পারে।
সিপিডি সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ও পদক্ষেপ মূল্যায়নের জন্য প্রায় ৩৬২টি উদ্যোগকে নয়টি ভাগে নিয়ে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’ তৈরি করেছে। এর মধ্যে সুশাসন-সংক্রান্ত ১০৫টি ঘটনাও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা
সিপিডির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। তবে বিদ্যমান প্রবণতা বিবেচনায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
সিপিডির আশঙ্কা, অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধিও ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে সরকারের ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশে উঠেছে।
বন্ধ ৯৫ কারখানা, কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজারের বেশি
শিল্প খাতের পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে।
কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরাসরি ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। একই সময়ে শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে এবং উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধিও ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে চাপে শিল্প
সিপিডি বলছে, জ্বালানি সংকট শিল্প খাতের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহে জটিলতা ও কার্গো গ্রহণে সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসি থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি ফেরেনি
মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি বলে মনে করছে সিপিডি। তাদের হিসাবে, সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হলেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক। ফলে মূল্যস্ফীতি কমার পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি আনতে পারেনি বলে মনে করছে সংস্থাটি।
রপ্তানি বাড়লেও আমদানি ও বাণিজ্য ঘাটতিতে চাপ
সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে একই সময়ে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থানও ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। চলতি হিসাবের ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তও ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি বেতন কাঠামো নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের তাগিদ
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সরকারের রাজনৈতিক সাহসের ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, বিষয়টি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা কমবে না; বরং সময় যত গড়াবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে। তার মতে, শুরুতেই ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে পর্যায়ক্রমে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া যেত।
তিনি বলেন, বেতন-ভাতার সিদ্ধান্তে বিলম্ব হলে সরকারের অন্যান্য কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন সরকারের ৬ মাসে অর্থনীতিতে স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তিই বেশি: সিপিডি
সুশাসন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও সিপিডি বেশ কিছু উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতিরও কিছু ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটেছে।
এ ছাড়া মব সহিংসতা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মতো ঘটনা অব্যাহত থাকায় সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করে সিপিডি।
কিছু পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলছে সিপিডি
তবে সরকারের সব পদক্ষেপকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছে না সিপিডি। ব্যক্তিগত করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, অপ্রকাশিত অর্থ বৈধ করার প্রস্তাব প্রত্যাহার, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল আয়কর ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আরএমজির বাইরে রপ্তানিমুখী শিল্পে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা সম্প্রসারণকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সিইপিএ স্বাক্ষর, বিডা-বেজা-পিপিপিএ একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ চালু, স্টার্টআপ ফান্ড গঠন, প্রবীণদের মেট্রো ও ট্রেন ভাড়ায় ছাড় এবং নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুকেও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যাংক খাতে পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন এবং পাঁচটি অকার্যকর এনবিএফআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ প্রয়োগকেও ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও শীর্ষ পর্যায়ের নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা।
সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজের সুপারিশ
অর্থনীতির বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় অক্টোবর ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদের একটি ‘কোর বাজেট’ তৈরির সুপারিশ করেছে সিপিডি। একই সঙ্গে জ্বালানি, ব্যাংকিং খাত, এনবিআর, রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়, এডিপি, লজিস্টিকস, ডিজিটালাইজেশন এবং বেতন কমিশনকে নিয়ে একটি সমন্বিত সংস্কার প্যাকেজ গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা এবং জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সিপিডির মতে, অর্থনীতিকে টেকসই পুনরুদ্ধারের পথে নিতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ না নিয়ে রাজস্ব, ব্যাংকিং, জ্বালানি, শিল্প, বিনিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া জরুরি।

