ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

২৩৫ ইউনিটের বিদ্যুৎ বিল ৫০৬ কোটি টাকা, বরখাস্ত ৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম

২৩৫ ইউনিটের বিদ্যুৎ বিল ৫০৬ কোটি টাকা, বরখাস্ত ৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী

ছবিঃ সংগৃহীত

মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে মাগুরার এক আবাসিক গ্রাহকের নামে ইস্যু করা হয়েছিল ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকার বিল। অস্বাভাবিক এই বিল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে তদন্তে বেরিয়ে আসে বিল তৈরির ক্ষেত্রে গুরুতর প্রযুক্তিগত ও মানবিক ভুলের তথ্য।

ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে দায় নির্ধারণের পর মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মহিতুল ইসলামসহ চার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী গ্রাহকের কাছে সরাসরি ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

মন্ত্রণালয়ের বুধবারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

২৩৫ ইউনিটের বিপরীতে ৫০৬ কোটি টাকার বিল

মাগুরা সদর উপজেলার কেচুয়াডুবি গ্রামের বাসিন্দা মোছা. আলেয়া খাতুনের আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগে মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব দেখিয়ে প্রথমে ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকার বিল তৈরি করা হয়।

একজন সাধারণ আবাসিক গ্রাহকের জন্য এমন অস্বাভাবিক অঙ্কের বিল তৈরি হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত নজরে আসে। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়লে বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়।

ঘটনাটি যাচাই করে কর্তৃপক্ষ ভুলটি সংশোধন করে নতুন বিল ইস্যু করে। সংশোধিত বিলে গ্রাহকের প্রকৃত পরিশোধযোগ্য অর্থ নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৯৬৩ টাকা। আলেয়া খাতুন ওই সংশোধিত বিল পরিশোধও করেছেন।

মিটার পরিবর্তনের সময় ভুল তথ্য বসানো

মন্ত্রণালয়ের তদন্তে বিল তৈরির ক্ষেত্রে একটি গুরুতর প্রযুক্তিগত ভুলের বিষয়টি উঠে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মিটার পরিবর্তনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা অসাবধানতাবশত মিটারের সিল নম্বরটি ‘ডিমান্ড চার্জ’-এর ঘরে বসিয়ে দেন।

এই ভুল তথ্যের ভিত্তিতেই বিলিং ব্যবস্থায় অস্বাভাবিক অঙ্কের হিসাব তৈরি হয়। পরবর্তী পর্যায়ে সেটিই গ্রাহকের নামে প্রায় ৫০৭ কোটি টাকার বিল হিসেবে প্রতিফলিত হয়।

অর্থাৎ, ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রকৃত হিসাবের সঙ্গে বিলের অঙ্কের কোনো বাস্তবসম্মত সামঞ্জস্য ছিল না। সংশোধিত বিলের পরিমাণ ১ হাজার ৯৬৩ টাকা হওয়ায় প্রথম বিলটি যে গুরুতর ত্রুটির ফল ছিল, তা স্পষ্ট হয়।

চার কর্মকর্তা-কর্মচারী সাময়িক বরখাস্ত

ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর দায় নির্ধারণের অংশ হিসেবে চার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ব্যক্তিরা হলেন—মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মহিতুল ইসলাম, আড়পাড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিলিং সুপারভাইজার সীমা রানী রায়, বিলিং সহকারী সোমা রানী ঘোষ এবং মিটার রিডার কাম মেসেঞ্জার মোহাম্মদ তোরাপ আলী।

তাদের যশোর ও মাগুরার বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া মহম্মদপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের ডিজিএম এস এম শাহিন আহসানকে ভারপ্রাপ্ত জিএম হিসেবে মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

গ্রাহককে ফোন করে দুঃখ প্রকাশ মন্ত্রীর

ঘটনাটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভুক্তভোগী গ্রাহক আলেয়া খাতুনকে সরাসরি ফোন করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।

ফোনালাপে মন্ত্রী অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তিনি বলেন, সরকার জনবান্ধব ও সেবাধর্মী প্রশাসন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। একজন সাধারণ গ্রাহককে এমন বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হওয়ায় তিনি অনুতপ্ত বলেও জানান।

‘একের পর এক ফোনে মাথা গোলমাল হয়ে গিয়েছিল’

হঠাৎ করে সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকার কাছাকাছি বিদ্যুৎ বিল হাতে পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই হতবাক হয়ে যান আলেয়া খাতুন।

ঘটনার পর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোন আসতে থাকায় পরিস্থিতি আরও বিড়ম্বনাকর হয়ে ওঠে। নিজের প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, একের পর এক ফোনের চাপে তার মাথা গোলমাল হয়ে গিয়েছিল।

পরে সংশোধিত বিল পাওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং তিনি ১ হাজার ৯৬৩ টাকার বিল পরিশোধ করেন।

নজরদারি ও বিল যাচাই নিয়ে প্রশ্ন

একজন গ্রাহকের মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বেশি বিল তৈরি হওয়া বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থার যাচাই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

কারণ, আবাসিক গ্রাহকের স্বাভাবিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের তুলনায় এই অঙ্ক এতটাই অস্বাভাবিক যে বিল চূড়ান্ত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে তা শনাক্ত হওয়ার সুযোগ থাকার কথা। বিশেষ করে মিটার পরিবর্তন, মিটার নম্বর, সিল নম্বর, ডিমান্ড চার্জ এবং ইউনিট ব্যবহারের তথ্য সফটওয়্যারে এন্ট্রির ক্ষেত্রে একাধিক ধাপে তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।

এ ধরনের ভুল যাতে ভবিষ্যতে কোনো গ্রাহকের ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য বিলিং তথ্য যাচাই এবং মিটার পরিবর্তনের পর ডাটা এন্ট্রি প্রক্রিয়ায় আরও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সাধারণ গ্রাহকের ভোগান্তি কমানোর প্রশ্ন

বিদ্যুৎ বিল একটি নিয়মিত নাগরিক সেবার অংশ। তাই বিল তৈরির ক্ষেত্রে সামান্য ভুলও গ্রাহকের জন্য আর্থিক ও মানসিক ভোগান্তির কারণ হতে পারে। মাগুরার ঘটনাটি সেই ঝুঁকিই সামনে এনেছে।

যদিও সংশোধিত বিল দ্রুত ইস্যু করে সমস্যার সমাধান করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবু এত বড় অঙ্কের ভুল কীভাবে প্রাথমিক যাচাই পেরিয়ে গ্রাহকের হাতে পৌঁছাল—সে প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে মিটার পরিবর্তনের পর তথ্য এন্ট্রি, বিল প্রস্তুত, বিল অনুমোদন এবং গ্রাহকের কাছে পাঠানোর আগের যাচাই—প্রতিটি ধাপে দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অস্বাভাবিক বিলের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।

মাগুরার এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত একটি ভুল বিল সংশোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থার ত্রুটি চিহ্নিত করে স্থায়ী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!