মাগুরায় ৮ বছরের শিশু আছিয়া আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল এবং ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে সোমবার (৩১ আগস্ট) এ রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিটু শেখের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে ছিলেন হাফিজুর রহমান খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির ও ইমাম হোসেন তারেক।
যেভাবে ঘটে শিশু আছিয়ার ওপর নির্মমতা
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের রমজানের ছুটিতে মাগুরা সদর উপজেলার নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল ৮ বছরের শিশু আছিয়া আক্তার।
গত বছরের ৫ মার্চ রাতে সেখানে শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়। মামলার প্রধান আসামি ও শিশুটির বোনের শ্বশুর হিটু শেখের বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা করার অভিযোগ ওঠে।
গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়।
আছিয়ার মৃত্যুতে পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঘটনাটি দ্রুত আলোচনায় আসে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে।
চারজনের বিরুদ্ধে মামলা
শিশু আছিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তার মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে চার আসামিকেই গ্রেপ্তার করে।
তদন্ত শেষে পুলিশ ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল আদালতে মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর ২৩ এপ্রিল আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২৭ এপ্রিল। বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন।
নিম্ন আদালতে হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড
মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক কার্যক্রম শেষে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
একই সঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে মামলার অপর তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
আইন অনুযায়ী, কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর সেই রায় কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এ কারণে নিম্ন আদালতের রায় ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসে। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হিটু শেখও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন।
হাইকোর্টে শুনানি শেষে মৃত্যুদণ্ড বহাল
হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর হাইকোর্টে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আদালত রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন।
সোমবার হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ রায় ঘোষণা করে নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। ফলে শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রইল।
এ রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটির উচ্চ আদালতের পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে প্রচলিত আইন অনুযায়ী আসামির আরও আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আলোচিত মামলায় দ্রুত বিচার
শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি দেশের আলোচিত শিশু নির্যাতন মামলাগুলোর একটি। মামলার অভিযোগপত্র দাখিল, অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হওয়ায় বিচার কার্যক্রমও দ্রুত এগিয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর নিম্ন আদালতে বিচার শেষ হয় এবং প্রধান আসামির মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শিশু আছিয়ার পরিবার ও স্বজনদের কাছে হাইকোর্টের এ রায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি
আছিয়ার মতো শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ, অপরাধের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগী পরিবারের আইনি সহায়তা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার মধ্য দিয়ে আদালত গুরুতর এ অপরাধে নিম্ন আদালতের দেওয়া সর্বোচ্চ শাস্তির সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেন।

