পাবনা থেকে কুড়িগ্রামের সীমান্ত দিয়ে দেশ ছাড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা তিন কিশোরীকে আটক করেছে পুলিশ। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাতে কুড়িগ্রাম পৌর এলাকা থেকে তাদের উদ্ধার করে কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশ। পরে তাদের নিরাপদে পাবনা সদর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
উদ্ধার হওয়া তিন কিশোরীর বয়স যথাক্রমে ১৪, ১২ ও ১২ বছর। তারা সবাই পাবনার চর আশুতোষপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে দুজন পরস্পরের মামাতো-ফুফাতো বোন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
বিদ্যালয়ে না গিয়ে শুরু হয় যাত্রা
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে তিন কিশোরী বাড়ি থেকে বের হয়ে বিদ্যালয়ে যায়। তবে তারা সেদিন ক্লাসে অংশ নেয়নি। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে প্রথমে অটোরিকশায় অনন্ত মোড় এলাকায় যায়। সেখান থেকে আরেকটি অটোরিকশায় তারা পাবনা বাস টার্মিনালে পৌঁছে।
এরপর পাবনা থেকে নাটোরগামী একটি বাসে ওঠে তিনজন। নাটোরে নেমে তারা রংপুরগামী বাসে ওঠে। রংপুরে পৌঁছে সেখান থেকে কুড়িগ্রামগামী বাসে যাত্রা করে। সন্ধ্যার দিকে তারা কুড়িগ্রাম বাস টার্মিনালে পৌঁছায়।
অচেনা শহরে রাত কাটানোর জন্য তারা হোটেল বা থাকার জায়গা খুঁজছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় নারীর নজরে পড়ে তিন কিশোরী
কুড়িগ্রাম বাস টার্মিনাল এলাকায় তিন কিশোরীর গতিবিধি দেখে সন্দেহ হয় কুড়িগ্রাম সদর থানার এসআই তাজের স্ত্রীর। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, তারা ওই এলাকার বাসিন্দা নয়।
পরিস্থিতি বিবেচনায় তিন কিশোরীকে তিনি নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থা করেন এবং নিরাপদে থাকার সুযোগ দেন। পরে বিষয়টি তিনি তাঁর স্বামী এসআই তাজকে জানান।
কথাবার্তার একপর্যায়ে কৌশলে তিন কিশোরীর কাছ থেকে তাদের বাবা-মায়ের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন এসআই তাজ। পরে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানান। পাশাপাশি কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশকেও অবহিত করেন।
নিখোঁজের ঘটনায় পাবনায় তিনটি জিডি
এদিকে একই বিদ্যালয় ও একই এলাকার তিন কিশোরী একসঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে পাবনা সদর থানায় পৃথক তিনটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল।
তিন কিশোরীর নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পাবনা জেলা পুলিশ তাদের সন্ধানে তৎপরতা শুরু করে। একপর্যায়ে কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশের সঙ্গে পাবনা পুলিশের যোগাযোগ হয় এবং কিশোরীদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
পরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশ তিন কিশোরীকে পাবনা সদর থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
সীমান্ত দিয়ে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনার দাবি
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তিন কিশোরীর মধ্যে একজনের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়ে মানসিক কষ্ট ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে পরিবারের সদস্যদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের অভিযোগও উঠে এসেছে।
পরিবারের এমন আচরণে কিশোরীটি দীর্ঘদিন ধরে মানসিকভাবে হতাশ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য। একপর্যায়ে সে গ্রাম ও দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার চিন্তা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটিএসের অনুষ্ঠান দেখার মাধ্যমে সে ওই ব্যান্ডের ভক্ত হয়ে ওঠে বলেও জানা গেছে।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কিশোরীটি কুড়িগ্রামের সীমান্ত দিয়ে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনার কথা তার দুই সহপাঠীকে জানায়। পরে তারাও বন্ধুর সঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল বাবার জমানো টাকা
পরিকল্পনা অনুযায়ী তিন কিশোরীর মধ্যে একজন বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তার বাবার জমানো এক লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে আসে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
তবে কী উদ্দেশ্যে ওই টাকা নেওয়া হয়েছিল এবং সীমান্ত অতিক্রমের পর তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্য কোথায় ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নিরাপদে পরিবারের কাছে ফেরানোর উদ্যোগ
কুড়িগ্রাম সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, তিন কিশোরীকে নিরাপদে পাবনা সদর থানা পুলিশের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের এ উদ্যোগে অচেনা শহরে বিপদে পড়ার আগেই কিশোরীদের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবার ও বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও শিশু-কিশোরীদের চলাফেরা, মানসিক অবস্থা এবং অনলাইনভিত্তিক নানা প্রভাবের বিষয়ে আরও সচেতন থাকার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
তিন কিশোরীর নিখোঁজ হওয়ার কারণ, দেশ ছাড়ার পরিকল্পনার পেছনে অন্য কারও প্ররোচনা বা সহযোগিতা ছিল কি না এবং তারা সীমান্ত এলাকায় কীভাবে পৌঁছেছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ।

