ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

শ্রীপুরে পোশাককর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগ, ৯ দিনেও মামলা হয়নি; পুলিশের বিরুদ্ধে আপসের প্রস্তাবের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০৫:৪৯ পিএম

শ্রীপুরে পোশাককর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগ, ৯ দিনেও মামলা হয়নি; পুলিশের বিরুদ্ধে আপসের প্রস্তাবের অভিযোগ

ছবিঃ সংগৃহীত

গাজীপুরের শ্রীপুরে বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন এক পোশাককর্মী। ভুক্তভোগীর দাবি, গত ২৯ আগস্ট রাতে বাড়ির মালিক কৌশলে তাঁর ঘরে ঢুকে তাঁকে ধর্ষণ করেন এবং ঘটনা প্রকাশ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেন। ঘটনার বিচার চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও নয় দিনেও মামলা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। বরং পুলিশ তাঁকে অভিযুক্তের সঙ্গে আপসের পরামর্শ দিয়েছে বলেও দাবি করেছেন ওই নারী।

তবে অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, ভুক্তভোগী নিজেই অভিযুক্তের সঙ্গে আপসের কথা বলেছিলেন। অন্যদিকে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, পুলিশ আপস করতে পারে না। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার।

ঘটনার অভিযোগ যেভাবে

ভুক্তভোগী নারী (৪৪) জামালপুর জেলার বাসিন্দা। তিনি শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের মুলাইদ এলাকায় একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন এবং স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৯ আগস্ট রাতে বাড়ির মালিক আব্দুর রশিদ (৫০) কৌশলে তাঁর কক্ষে প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে তাঁকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন ওই নারী। পরে বিষয়টি কাউকে জানালে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও তাঁর দাবি।

অভিযুক্ত আব্দুর রশিদ মুলাইদ গ্রামের মৃত রহমত আলীর ছেলে।

ঘটনার পর বিচার ও আইনি প্রতিকার চেয়ে চলতি মাসের ৯ সেপ্টেম্বর শ্রীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী।

অভিযোগ সংশোধনের পরও মামলা হয়নি

ভুক্তভোগীর দাবি, থানায় অভিযোগ দেওয়ার পর তদন্ত কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী অভিযোগপত্র কয়েক দফা পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু এরপরও মামলা নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, মামলা করার জন্য নয়বার থানায় গিয়েছেন। প্রতিবারই তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং তদন্তের কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।

ভুক্তভোগীর আরও দাবি, বিষয়টি নিয়ে তিনি গাজীপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়েও যান। সেখানে মামলা নেওয়ার আশ্বাস পেলেও পরে থানায় মামলা হয়নি।

পুলিশের বিরুদ্ধে আপসের প্রস্তাবের অভিযোগ

ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, সর্বশেষ তাঁকে অভিযুক্তের সঙ্গে আপস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এমনকি অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁর।

তিনি বলেন, পুলিশ তাঁকে ভয় দেখিয়ে বলেছে—অভিযুক্ত পক্ষ প্রভাবশালী ও অর্থশালী; তারা তাঁর ক্ষতি করতে পারে। তাই আপস করাই ভালো হবে বলে তাঁকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য

অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা রাখাল চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ২৯ আগস্ট রাতে ওই নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে তাঁকে জানিয়েছেন। ৯ সেপ্টেম্বর তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তিনি এক দফা ভুক্তভোগীর বাড়িতে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করেছেন। তবে তাঁর দাবি, ওই নারী নিজেই অভিযুক্তের সঙ্গে আপসের কথা বলেছিলেন।

রাখাল চন্দ্র দেবনাথের ভাষ্য, অভিযুক্তকে আটক করার পর মামলা করার বিষয়ে তিনি ভুক্তভোগীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তদন্তের সময় ভুক্তভোগীর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্তের সঙ্গে আপস-মীমাংসা করতে না পেরে ভুক্তভোগী পরে আবার মামলা করার জন্য থানায় আসেন।

‘পুলিশ তো আপস করতে পারে না’

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, বিষয়টি তাঁর বিস্তারিত জানা নেই। একটি অভিযোগ রয়েছে এবং তদন্ত কর্মকর্তা রাখাল চন্দ্র দেবনাথ বিষয়টি দেখছেন।

ওসি বলেন, ঘটনার বেশ কিছুদিন পর ভুক্তভোগী থানায় এসেছেন। তিনি আপসের কথা বলেছেন বলেও তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে জানতে পেরেছেন। তবে পুলিশ আপস করিয়ে দিতে পারে না।

মামলা করতে চাইলে মামলা হবে: পুলিশ সুপার

গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ভুক্তভোগী মামলা করতে চাইলে অবশ্যই মামলা হবে। কী কারণে এখনো মামলা হয়নি, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ সুপারের এই বক্তব্যের পর অভিযোগটির তদন্ত এবং থানায় মামলা না নেওয়ার কারণ নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে আইন অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন

ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর ভুক্তভোগী থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও কেন নয় দিনেও মামলা হয়নি—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে তদন্ত কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীর বক্তব্যে আপসের প্রসঙ্গ নিয়ে ভিন্নতা থাকায় বিষয়টি স্পষ্ট করতে পুলিশি তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা, ভুক্তভোগীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে থানায় অভিযোগ গ্রহণ ও মামলা করার প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের গাফিলতি বা অনিয়ম হয়েছে কি না, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের পর্যালোচনায় সেটিও স্পষ্ট হওয়ার কথা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!