ঢাকা বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

menu

সরকারি নির্মাণে ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ, এখনো অধরা শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০৪:৩৭ পিএম

সরকারি নির্মাণে ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ, এখনো অধরা শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা

ছবিঃ সংগৃহীত

কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি রক্ষা, ইটভাটার বায়ুদূষণ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারি নির্মাণকাজে পোড়ামাটির ইটের পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কয়েক বছর আগেই। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারকাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ব্লক ব্যবহারের হারে দেখা গেছে বড় ধরনের বৈষম্য।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহারের গড় হার ছিল ৬৯ শতাংশ। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) এ হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ। পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সরকারি নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবায়নের এই ব্যবধান উদ্যোগটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এ পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার সরকারি নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে আবারও তৎপর হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একাধিক সভা, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কমিটি গঠন, সরকারি প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় ব্লকের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা এবং উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্লকের দাম, ভ্যাট, ট্যাক্স ও কাঁচামালের শুল্ক কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

তবে নতুন উদ্যোগের সামনে এখনো কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারি দপ্তরগুলোর ক্রয়প্রক্রিয়ায় ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করা, দরপত্র ও নির্মাণসংশ্লিষ্ট নথি সংশোধন, উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই, বাজারে চাহিদা তৈরি এবং ব্লক ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো—সবকিছু সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় আগের মতোই ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা কাগজে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

২০১৯ সালের প্রজ্ঞাপন, লক্ষ্য পূরণ হয়নি নির্ধারিত সময়েও

২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সরকারি নির্মাণকাজে পোড়ামাটির ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর উদ্দেশ্য ছিল পর্যায়ক্রমে ইটের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানো।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০ শতাংশ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২০ শতাংশ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩০ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬০ শতাংশ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ শতাংশ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারকাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্য ছিল।

ভবনের দেয়াল, সীমানাপ্রাচীর, হেরিং বোন বন্ড রাস্তা এবং গ্রামীণ সড়কের নির্দিষ্ট শ্রেণির নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কারকাজে পোড়ামাটির ইটের পরিবর্তে ব্লক ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে সরকারি নির্মাণকাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও সামনে আসে। এ-সংক্রান্ত একটি রিটের রায়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ব্লক ব্যবহারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

কিন্তু প্রজ্ঞাপন, পরিকল্পনা ও নির্দেশনা থাকার পরও সরকারি সব সংস্থায় ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় এখন বাস্তবায়নের বাধাগুলো চিহ্নিত করে নতুন করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

গণপূর্তে ৬৯ শতাংশ, এলজিইডিতে মাত্র ১ শতাংশ

সরকারি নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বড় ব্যবধানের চিত্র পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহারের গড় হার ছিল ৬৯ শতাংশ। এর মধ্যে ১০ ইঞ্চি দেয়াল নির্মাণে ব্লক ব্যবহারের হার ৮১ শতাংশ, ৫ ইঞ্চি দেয়াল নির্মাণে ৬৭ শতাংশ এবং সড়ক নির্মাণকাজে ৬০ শতাংশ।

অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে ব্লক ব্যবহারের হার ছিল মাত্র ১ শতাংশ। গ্রামীণ অবকাঠামো ও সড়ক নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই সংস্থায় ব্লকের ব্যবহার এত কম হওয়ায় সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমন্বয় ও তদারকির ঘাটতির বিষয়টি সামনে এসেছে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুধু জাতীয় পর্যায়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না; প্রতিটি সরকারি সংস্থার জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্ব, সময়সীমা ও অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

কোন ধরনের নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহার করা সম্ভব, কত পরিমাণ ব্লক প্রয়োজন, দরপত্রে কীভাবে তা অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং নির্মাণকাজের গুণগত মান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

ব্লক ব্যবহারে নতুন সরকারের একাধিক উদ্যোগ

সরকারি নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে ২০২৬ সালের ১৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় সরকারি সব নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহারের উদ্যোগ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ওই সভায় অবৈধ ইটভাটা বন্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা, কাঠ পোড়ানো ইটভাটাকে অটো ইটভাটা ও ব্লক উৎপাদন কারখানায় রূপান্তরের উদ্যোগ এবং খাল খননের মাটি ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের মতো বিষয় আলোচনায় আসে। এ ছাড়া আমদানি করা কয়লার সালফারের পরিমাণ নির্ধারণের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এরপর ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আরেকটি সভায় সরকারি কাজের রেট সিডিউলে পোড়ামাটির ইটের দাম যৌক্তিকভাবে কমানো, ব্লকের ভ্যাট, ট্যাক্স ও কাঁচামালের শুল্ক কমানোর বিষয় পর্যালোচনা এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সড়কে ব্লক ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা হয়। নির্মাণকাজে মধ্যপাড়া খনির পাথর অ্যাগ্রিগেট হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

সরকারের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ব্লক উৎপাদন ও ব্যবহারকে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করা এবং সরকারি নির্মাণকাজে এর চাহিদা বাড়ানো।

তবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর ক্রয় পরিকল্পনা, দরপত্রের শর্ত, নির্মাণসামগ্রীর কারিগরি মান এবং সরবরাহকারীদের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।

অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে ১৩ সদস্যের কমিটি

সরকারি নির্মাণকাজে পরিবেশবান্ধব ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আইন) ড. মো. সাইদুর রহমানকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকৌশল দপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং কংক্রিট ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৩ অক্টোবর। সভায় সরকারি প্রকৌশল দপ্তরগুলোর ব্লক ব্যবহারের অগ্রগতি পর্যালোচনা, বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা, পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশোধিত প্রস্তাব পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়।

এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি), প্রাক্কলন, নকশা, ড্রয়িং, কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ের তালিকা (বিওকিউ), দরপত্রের নথি এবং কাজের সময়সূচিতে ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

অর্থাৎ, শুধু নির্মাণকাজের সময় ব্লক ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া নয়, প্রকল্প পরিকল্পনা ও ক্রয়প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই ব্লক ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

‘লক্ষ্যমাত্রা বাতিল হয়নি, বাস্তবায়ন হয়নি’

কমিটির আহ্বায়ক ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, সরকারি নির্মাণকাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্য আগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্য বাতিল হয়নি, তবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

তিনি জানান, ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর ক্রয় পরিকল্পনায় ব্লকের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি স্থাপনাগুলোতে ধীরে ধীরে ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। কমিটির মাধ্যমে বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বর্তমানে সরকারি স্থাপনাগুলোতে ঠিক কত শতাংশ ব্লক ব্যবহার হচ্ছে, তার একক ও সুনির্দিষ্ট চিত্র নেই বলেও জানান তিনি। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অগ্রগতিতে পার্থক্য রয়েছে। কোনো কোনো সংস্থা ব্লকের ব্যবহার বাড়িয়েছে, কোনো কোনো সংস্থা মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে, আবার কোথাও অগ্রগতি খুবই কম।

ড. সাইদুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ক্রয় পরিকল্পনায় ব্লকের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে কি না এবং সেই অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরপর সরবরাহকারীরা চাহিদা অনুযায়ী ব্লক দিতে পারছেন কি না, সেটিও যাচাই করা হবে।

তিনি আরও জানান, এ মুহূর্তে নতুন করে কোনো সময়সীমা নির্ধারণ বা আগের লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি। প্রথমে বড় ক্রয়কারী সরকারি সংস্থাগুলোর পর্যায়ে কাজ করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে তাদের ক্রয় পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

দেশে প্রায় ৪০০ ব্লক কারখানা, উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে দাবি

সরকারি কাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ কংক্রিট ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৪০০টি কংক্রিট ব্লক উৎপাদন কারখানা রয়েছে।

সমিতির দাবি, প্রতিটি কারখানায় দৈনিক ৫০ হাজার ব্লক উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। সেই হিসাবে সব কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি ব্লক হতে পারে।

তবে উৎপাদন সক্ষমতা এবং বাস্তবে উৎপাদিত ব্লকের পরিমাণ এক নয়। কারখানার যন্ত্রপাতি, কাঁচামালের সরবরাহ, অর্থায়ন, বাজারের চাহিদা এবং উৎপাদন ব্যয়ের ওপর প্রকৃত উৎপাদন নির্ভর করে।

বাংলাদেশ কংক্রিট ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতির সহসভাপতি মনিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সরকারি নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও নানা কারণে তা পূরণ হয়নি। এতে ব্লক উৎপাদনকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে নতুন সরকার এ বিষয়ে আন্তরিকতা দেখিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

তার দাবি, বর্তমানে ব্লক উৎপাদনকারীরা সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করছেন। সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ ব্লক ব্যবহারে গেলে উৎপাদনকারীরা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বাড়াতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বছরে প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি ইটের চাহিদা রয়েছে।

তবে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের আগে প্রকৃত চাহিদা, ব্লকের বিভিন্ন ধরন, প্রয়োজনীয় মান, কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা এবং পরিবহনব্যয় যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষিজমির মাটি কাটায় কমছে উর্বরতা

পোড়ামাটির ইট উৎপাদনের জন্য কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার পরিবেশগত উদ্বেগের একটি বড় কারণ। জমির ওপরের স্তরে জৈব পদার্থ ও উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থাকে। এ স্তর কেটে ইট তৈরি করা হলে মাটির স্বাভাবিক গঠন ও উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, দেশে ইট তৈরির জন্য বছরে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমির মাটি কাটা হয়। এতে কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে ফসলের ফলন, জমির গুণগত মান এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর।

প্রাপ্ত তথ্যে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইটভাটার জন্য মাটির উপরিভাগের প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত স্তর অপসারণ করা হতে পারে। তবে ফসলের ফলন কতটা কমবে, তা মাটির ধরন, জমির অবস্থা এবং ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে।

কৃষিজমির মাটি রক্ষায় পোড়ামাটির ইটের ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইটভাটার দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

কৃষিজমির ক্ষতির পাশাপাশি ইটভাটার ধোঁয়া, ধুলা ও জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট দূষণ পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ইটভাটায় ব্যবহৃত কয়লার মান, জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা এবং চুল্লির প্রযুক্তির ওপর নির্গমনের পরিমাণ নির্ভর করে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনায় বায়ুদূষণের উৎস হিসেবে ইটভাটার অবদানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের তথ্যের বরাত দিয়ে সেখানে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে বড় ধরনের ক্ষতির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।

বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্‌রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে ইটভাটার কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষ, শ্রমিক এবং শিশুদের জন্য দূষিত বায়ুর প্রভাব উদ্বেগের বিষয়।

তবে পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করতে ব্লক উৎপাদনের কাঁচামাল, জ্বালানি ব্যবহার, উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং নির্মাণকাজে উপযুক্ত প্রয়োগের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদনব্যবস্থাকে পরিবেশসম্মত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

দাম, ভ্যাট ও কর কমানোর দাবি

সরকারি নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে উৎপাদনব্যয়ের পাশাপাশি বাজারমূল্যও গুরুত্বপূর্ণ। ব্লকের দাম তুলনামূলক বেশি হলে সরকারি ও বেসরকারি নির্মাণকাজে এর ব্যবহার বাড়ানো কঠিন হতে পারে।

এ কারণে ব্লকের ভ্যাট, ট্যাক্স ও কাঁচামালের শুল্ক কমানোর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে সরকার। একই সঙ্গে সরকারি কাজের রেট সিডিউল সংশোধন এবং পোড়ামাটির ইটের মূল্য যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশ কংক্রিট ব্লক প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি মনে করে, সরকারি নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনকারীরা বাজারের নিশ্চয়তা পাবেন। এতে নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে ব্লক ব্যবহারে প্রকৃত সাশ্রয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু নির্মাণসামগ্রীর একক দাম বিবেচনা করলেই হবে না। পরিবহন, শ্রমিকের দক্ষতা, নির্মাণের সময়, স্থায়িত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রকল্পের নকশাও বিবেচনায় নিতে হবে।

ড. সাইদুর রহমানের মতে, ব্লক সাশ্রয়ী দামে পাওয়া এবং সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণকাজে যুক্ত শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকলে ব্লক ব্যবহারের প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে।

ইটভাটা থেকে ব্লক কারখানায় রূপান্তরের সম্ভাবনা

সরকারের পরিকল্পনায় ইটভাটার মালিকদের বিকল্প উৎপাদনব্যবস্থায় যুক্ত করার বিষয়টিও রয়েছে। যেসব ইটভাটা পরিবেশগত ও আইনগত বিধিনিষেধের কারণে সমস্যায় রয়েছে, সেগুলোর মালিকদের ব্লক উৎপাদনের দিকে উৎসাহিত করার কথা বলা হচ্ছে।

এ ধরনের রূপান্তর সফল হলে বিদ্যমান উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামোর কিছু অংশ কাজে লাগিয়ে বিকল্প নির্মাণসামগ্রীর উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ইটভাটা থেকে ব্লক কারখানায় রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বাজারের নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে হবে।

‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন, ২০১৩’-এর অধীনে ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনায় বিভিন্ন বিধিনিষেধ রয়েছে। আবাসিক এলাকা, বনাঞ্চল, পৌরসভা এবং পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকার আশপাশে ইটভাটা স্থাপনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত দূরত্বসংক্রান্ত বিধান অনুসরণ করতে হয়।

তবে আইনগত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের পাশাপাশি ইটভাটার মালিক ও শ্রমিকদের বিকল্প জীবিকা এবং উৎপাদনব্যবস্থায় রূপান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বাস্তবায়নেই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

সরকারি নির্মাণকাজে শতভাগ ব্লক ব্যবহারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রতিটি সরকারি সংস্থার জন্য বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, প্রকল্পের নকশা ও দরপত্রে ব্লকের ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা এবং নির্ধারিত সময় পরপর অগ্রগতি পর্যালোচনা করলে বাস্তবায়নের ঘাটতি চিহ্নিত করা সহজ হবে।

একই সঙ্গে উৎপাদনকারীদের প্রকৃত সক্ষমতা, বাজারের চাহিদা, পরিবহনব্যয় এবং পণ্যের মান যাচাই করা জরুরি। চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হতে পারে। আবার পর্যাপ্ত বাজার তৈরি না হলে উৎপাদনকারীদের বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

পরিবেশবান্ধব নির্মাণব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারি ক্রয়নীতি, উৎপাদন সক্ষমতা, বাজারমূল্য এবং নির্মাণকাজের কারিগরি মানের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সব মিলিয়ে, সরকারি নির্মাণকাজে পোড়ামাটির ইটের পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের উদ্যোগ বাংলাদেশের কৃষিজমি ও পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ২০১৯ সালে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা সময়মতো বাস্তবায়িত না হওয়ায় নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ঘোষিত সিদ্ধান্তকে বাস্তব কাজে রূপ দেওয়া। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি, উৎপাদনকারীদের জন্য কার্যকর নীতিগত সহায়তা এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!