ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

ঢাকার ৩২ রুটে এক কোম্পানির বাস, এবার কি ফিরবে সড়কে শৃঙ্খলা?

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম

ঢাকার ৩২ রুটে এক কোম্পানির বাস, এবার কি ফিরবে সড়কে শৃঙ্খলা?

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে আবারও বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের যানজট, বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো, বেপরোয়া ওভারটেকিং এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে গণপরিবহন পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় ঢাকার ৩২টি রুটে ৩২টি নির্ধারিত কোম্পানির মাধ্যমে বাস চলাচলের কথা রয়েছে। অর্থাৎ, একটি রুট পরিচালনার দায়িত্ব থাকবে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির হাতে।

নতুন ব্যবস্থায় বাসের সংখ্যা, নির্ধারিত স্টপেজ, ই-টিকিটিং, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং চালক-সহকারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। দৈনিক ট্রিপ ও যাত্রীসংখ্যার ভিত্তিতে আয়ের পরিবর্তে চালক-সহকারীদের মাসিক বেতনের আওতায় আনার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এতে বেশি যাত্রী তোলার জন্য বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে, যাত্রীসেবার মান বাড়বে এবং সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হবে।

তবে অতীতের অভিজ্ঞতা নতুন উদ্যোগের সফলতা নিয়ে প্রশ্নও তৈরি করেছে। এর আগে রুট র‍্যাশনালাইজেশন ও ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ চালুর মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। ফলে এবারও পরিকল্পনাটি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবে ঢাকার গণপরিবহনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে—তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে।

ঢাকার যানজটের বড় কারণ অপরিকল্পিত বাস চলাচল

ঢাকার দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম বড় সমস্যা যানজট। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের প্রতিদিন দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকতে হয়। যানজটের পেছনে নানা কারণ থাকলেও অপরিকল্পিত গণপরিবহনব্যবস্থা, বাসের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং একই সড়কে একাধিক কোম্পানির বাসের প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

রাজধানীর অনেক সড়কে দেখা যায়, যাত্রী পাওয়ার আশায় একটি বাস আরেকটি বাসকে পাশ কাটিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কখনো মাঝসড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে, কখনো নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে বাস থামানো হচ্ছে। একই রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে আগে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা থেকে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। এতে অন্য যানবাহনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং যানজট আরও দীর্ঘায়িত হয়।

এ ধরনের প্রতিযোগিতা শুধু যাতায়াতের সময় বাড়ায় না, সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি করে। বেপরোয়া ওভারটেকিং, হঠাৎ ব্রেক করা, রাস্তার মাঝখানে বাস থামানো এবং চলন্ত অবস্থায় যাত্রী ওঠানো-নামানোর মতো ঘটনা যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।

অন্যদিকে, অনেক বাসের আসন, পরিচ্ছন্নতা ও যাত্রী ওঠানামার পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ভাঙা আসন, অপরিচ্ছন্ন ভেতরের অংশ এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ে। ফলে ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানো এখন নগরবাসীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।

আগেও নেওয়া হয়েছিল রুট র‍্যাশনালাইজেশনের উদ্যোগ

ঢাকার বাস চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে অতীতেও বিভিন্ন সরকার নানা পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রুট র‍্যাশনালাইজেশন বা বাস রুট পুনর্বিন্যাস কার্যক্রম। দীর্ঘ আলোচনা ও পরিকল্পনার পর ২০২১ সালে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ চালুর মাধ্যমে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়।

পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল নির্দিষ্ট রুটে নির্ধারিত বাস পরিচালনা, যাত্রী ওঠানামার জন্য নির্দিষ্ট স্টপেজ তৈরি এবং বাসের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়। নির্ধারিত রুটে ঢাকা নগর পরিবহনের বাস চললেও একই পথে অন্য কোম্পানির বাস চলাচল অব্যাহত থাকে। ফলে প্রতিযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সমন্বয়ের ঘাটতি, পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবসায়িক স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে উদ্যোগটি প্রত্যাশিত গতি পায়নি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যাত্রী পরিবহনের চাপ এবং যানজটের কারণে কাঙ্ক্ষিত আয় করতে না পারার অভিযোগও তুলেছিলেন বাসচালকেরা।

অতীতের এই অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট, শুধু রুট নির্ধারণ করলেই গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সব বাসকে নির্ধারিত নিয়মের আওতায় আনা, কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা, পরিচালন ব্যয় ও আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নিয়ম ভঙ্গের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

চুক্তিভিত্তিক বাস পরিচালনায় বাড়ছে প্রতিযোগিতা

ঢাকার বাস চলাচলে অসুস্থ প্রতিযোগিতার অন্যতম কারণ হিসেবে চুক্তিভিত্তিক পরিচালনব্যবস্থাকে দায়ী করছেন চালক ও সহকারীদের অনেকে। তাদের দাবি, দৈনিক নির্ধারিত অর্থ মালিককে দেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি, সহকারী ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে হয়। এ কারণে বেশি আয় করার চাপ থেকেই অনেক চালক বেশি যাত্রী তোলার চেষ্টা করেন।

চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বাস সারাদিন চালানোর জন্য মালিককে প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা দিতে হয়। এর বাইরে জ্বালানি, লাইনম্যানের চাঁদা এবং সড়কে বিভিন্ন কারণে জরিমানার খরচও বহন করতে হয় বলে তাদের অভিযোগ। যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে ট্রিপের সংখ্যা কমে যায়, কিন্তু বাসের দৈনিক খরচ একইভাবে বহন করতে হয়। এতে অনেক সময় দিন শেষে প্রত্যাশিত আয় থাকে না।

বাসের সহকারীরাও একই ধরনের সমস্যার কথা জানান। তাদের বক্তব্য, যানজট ও যাত্রীসংকটের কারণে দৈনিক খরচ মেটানোর পর হাতে পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না। ফলে বেশি যাত্রী তোলা এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর চাপ তৈরি হয়।

তবে এ ধরনের আর্থিক চাপ থাকলেও তা বেপরোয়া গাড়ি চালানো কিংবা যাত্রীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যৌক্তিকতা তৈরি করে না। বরং পরিবহনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে চালক ও মালিক—উভয়ের জন্য কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

৩২ রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে বাস চালানোর পরিকল্পনা

নতুন পরিকল্পনায় ঢাকার বাস রুটগুলো পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি রুটে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতিতে বাস পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থায় প্রতিটি রুটের দায়িত্ব থাকবে একটি নির্ধারিত কোম্পানির হাতে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ওই রুটে বাস পরিচালনা, নির্ধারিত স্টপেজ অনুসরণ এবং যাত্রীসেবার মান বজায় রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, রুটভিত্তিক বাসের সংখ্যা নির্ধারণ, নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী ওঠানো-নামানো, ই-টিকিটিং চালু এবং জিপিএসের মাধ্যমে বাসের চলাচল পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হবে। একই সঙ্গে চালক ও সহকারীদের মাসিক বেতনভিত্তিক কাঠামোয় আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

এ ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, দৈনিক কত ট্রিপ দেওয়া গেল বা কত যাত্রী তোলা গেল—তার ওপর চালকের আয়ের চাপ কমানো। চালকের আয় যদি সরাসরি যাত্রীসংখ্যা ও ট্রিপের সঙ্গে অতিমাত্রায় নির্ভরশীল না থাকে, তাহলে বেশি যাত্রী পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করার প্রবণতা কমতে পারে।

এ ছাড়া একটি রুটে একাধিক কোম্পানির মধ্যে যাত্রী নিয়ে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে নির্ধারিত কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালিত হলে রুট ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান পর্যবেক্ষণ করা সহজ হতে পারে। তবে এ সুবিধা পেতে হলে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমের ওপর কার্যকর নজরদারি এবং নিয়ম ভঙ্গের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

স্টপেজভিত্তিক যাত্রী ওঠানামায় গুরুত্ব

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক মসিউর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় বাসগুলো যত্রতত্র থামতে পারবে না। নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামবে, সেখান থেকেই যাত্রী ওঠানো হবে এবং পরবর্তী স্টপেজে গিয়ে আবার যাত্রী ওঠানামা করবে।

তিনি বলেন, এতে বাস চলাচলে অন্তত কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরবে। পাশাপাশি প্রতি ট্রিপে কত যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব এবং পরিচালনব্যবস্থায় কীভাবে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রাখা যায়, সে বিষয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর লোকসানের ঝুঁকি কমানো যায়।

নির্ধারিত স্টপেজ কার্যকরভাবে চালু করা গেলে সড়কের মাঝখানে বাস থামানো, একাধিক বাসের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার প্রবণতা এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার কারণে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা কমতে পারে। তবে এ জন্য স্টপেজের অবস্থান, যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধা, ফুটপাতের ব্যবহার এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

ছয়টি রুট চূড়ান্ত, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের প্রস্তুতি

‘এক রুট, এক কোম্পানি’ উদ্যোগের আওতায় ইতোমধ্যে ছয়টি রুট চূড়ান্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পাশাপাশি পাঁচটি চক্রাকার রুট চালুর বিষয়েও আশাবাদী তারা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর থেকে চূড়ান্ত হওয়া ছয়টি রুটের যেকোনো দুটিতে পরীক্ষামূলকভাবে নতুন ব্যবস্থায় বাস চলাচল শুরু করতে বাসমালিকেরা সম্মত হয়েছেন। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিচালনব্যবস্থা, যাত্রীসেবা, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং বাস্তব সমস্যাগুলো মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল করতে শুধু বাস নামানোই যথেষ্ট নয়। নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ, পর্যাপ্ত বাস নিশ্চিত করা, যাত্রীদের জন্য সহজ টিকিটব্যবস্থা, স্টপেজে শৃঙ্খলা এবং বাসের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

প্রাথমিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা গেলে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য রুটে ব্যবস্থা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তা সহায়ক হতে পারে।

মালিকদের বিনিয়োগ ও দায়িত্ব নেওয়ার ওপর জোর

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বলেছেন, ব্যবসায় লাভ-লোকসানের ঝুঁকি থাকবে এবং সেই ঝুঁকি মালিকদেরই নিতে হবে। চালকের ওপর দৈনিক আয়ের চাপ দিয়ে চুক্তিভিত্তিক পদ্ধতিতে বাস পরিচালনা করা উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় পরিবহন কোম্পানিগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতিটি বাসমালিককে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ সই করতে হবে, যাতে দায়িত্ব, পরিচালনব্যবস্থা ও শর্তগুলো নির্দিষ্ট করা যায়।

এ উদ্যোগ কার্যকর করতে বাসমালিকদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদ্যমান বাসগুলোকে নতুন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা, রুটভিত্তিক পরিচালন ব্যয় নির্ধারণ, বাসের রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের বড় অংশ মালিক ও পরিবহন কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

তবে কোম্পানিগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং মালিকদের ন্যায্য মুনাফা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। এ জন্য চুক্তির শর্ত, অর্থনৈতিক সুবিধা ও দায়িত্বের বিষয়গুলো স্পষ্ট করা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিনিয়োগ ও আস্থাই বড় চ্যালেঞ্জ

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, বর্তমানে যারা পরিবহন খাতের নেতৃত্বে রয়েছেন এবং বাসের মালিক, তারা নিজেরা বিনিয়োগ করতে পারলে উদ্যোগটি টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। সরকারের অর্থায়নে বাস নামিয়ে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা কঠিন হতে পারে বলেও তিনি মত দেন।

তার মতে, মালিকদের বিনিয়োগে আগ্রহী করতে হলে তাদের জন্য উপযুক্ত প্রণোদনা দিতে হবে এবং নতুন ব্যবস্থায় লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব—এ বিষয়ে আস্থা তৈরি করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতির সফলতা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে বিনিয়োগের সক্ষমতা, ব্যবসায়িক ঝুঁকি, পরিচালন ব্যয়, কর্মীদের বেতন কাঠামো এবং যাত্রীসেবার মান বজায় রাখার সক্ষমতা।

নতুন ব্যবস্থার সফলতার জন্য যেসব বিষয় জরুরি

ঢাকার গণপরিবহনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতির পাশাপাশি কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, সব বাসকে নিয়মের আওতায় আনতে হবে। নির্ধারিত রুটে নির্ধারিত কোম্পানির বাস চলার কথা থাকলে অন্য বাসের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে আগের মতোই প্রতিযোগিতা ফিরে আসতে পারে।

দ্বিতীয়ত, চালকদের বেতন ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। মাসিক বেতনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলে বেতন সময়মতো দেওয়া, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, বিশ্রামের সুযোগ এবং সড়ক নিরাপত্তার নিয়ম মানা নিশ্চিত করা জরুরি।

তৃতীয়ত, আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব রাখতে হবে। বাসমালিক ও কোম্পানির মধ্যে চুক্তি, পরিচালন ব্যয়, আয়ের বণ্টন এবং লোকসানের দায় নির্ধারণে স্বচ্ছতা না থাকলে বিরোধ তৈরি হতে পারে।

চতুর্থত, ই-টিকিটিং ও জিপিএস কার্যকর করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাসের অবস্থান, চলাচলের সময়সূচি এবং যাত্রী পরিবহনের তথ্য পর্যবেক্ষণ করা গেলে ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। তবে প্রযুক্তি চালু করার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও তথ্য ব্যবহারের কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

পঞ্চমত, যাত্রীদের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাসের পর্যাপ্ততা, নির্ধারিত সময়সূচি, নিরাপদ ওঠানামা, পরিচ্ছন্নতা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে শুধু রুট ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে যাত্রীসেবার মান বাড়ানো কঠিন হবে।

এবার কি কমবে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা?

ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্দিষ্ট রুটে নির্দিষ্ট কোম্পানির বাস পরিচালনা, স্টপেজভিত্তিক যাত্রী ওঠানামা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং চালক-সহকারীদের মাসিক বেতনের আওতায় আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, পরিকল্পনা গ্রহণের চেয়ে তা বাস্তবায়ন করাই বড় চ্যালেঞ্জ। বাসমালিকদের সম্মতি, কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, চালকদের কর্মপরিবেশ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ম ভঙ্গের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ—সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নতুন ব্যবস্থা চালুর পর যেন পুরোনো সমস্যাগুলো অন্য রূপে ফিরে না আসে। নির্ধারিত রুটে বাস চললেও যদি সময়সূচি মানা না হয়, স্টপেজে শৃঙ্খলা না থাকে কিংবা কোম্পানিগুলো দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

রাজধানীর লাখো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতকে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও সময়সাশ্রয়ী করাই হওয়া উচিত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এখন দেখার বিষয়, ৩২ রুটে এক কোম্পানির বাস পরিচালনার পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি দুর্ঘটনা ও যাত্রীভোগান্তি কমাতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!