পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় গড়ে উঠছে অসংখ্য হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ। কোথাও পাহাড়-টিলা কেটে, কোথাও বনাঞ্চল ধ্বংস করে, আবার কোথাও নদী-জলাশয়ের তীর দখল করে নির্মাণ করা হচ্ছে এসব বাণিজ্যিক স্থাপনা। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও মনোরম পরিবেশের প্রচারণা চালানো হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ কিংবা কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ফলে একদিকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে পর্যটকদের জীবন ও নিরাপত্তাঝুঁকি।
কক্সবাজারের অনুমোদনহীন টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা এই অনিয়ন্ত্রিত রিসোর্ট ব্যবসার ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটনকেন্দ্রিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের নামে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিধিবিধান উপেক্ষা করা হলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়বে। পর্যটন খাতের টেকসই বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে শুধু নতুন স্থাপনা নির্মাণ নয়, বরং সেগুলোর বৈধতা, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রভাব যাচাই করাও জরুরি।
বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিনিধিদের অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অনুমোদনহীন রিসোর্ট ও কটেজের বিস্তারের চিত্র উঠে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, কক্সবাজারে সাত শতাধিক হোটেল-রিসোর্টের মধ্যে বহু প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই। বান্দরবানে পাঁচ শতাধিক রিসোর্ট ও কটেজের মধ্যে জেলা প্রশাসনের অনুমোদন রয়েছে মাত্র ৭৯টির। রাঙামাটিতে প্রায় ১০০টি রিসোর্টের মধ্যে ৭০টি অবৈধ বা অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতায় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খাগড়াছড়িতে ৪২টি আবাসিক হোটেলের মধ্যে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নবায়ন করেছে। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায়ও পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়াই কিছু পর্যটন স্থাপনা পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, কুয়াকাটা ও শ্রীমঙ্গলেও অনিয়ন্ত্রিত রিসোর্ট ব্যবসার চিত্র পাওয়া গেছে।
কক্সবাজারে শত শত প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৮০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ ও রিসোর্ট ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে। কক্সবাজার শহর, ইনানী, হিমছড়ি, পাটুয়ারটেকসহ বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক বছরে পর্যটকদের আবাসন ও বিনোদনকেন্দ্রিক স্থাপনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব এলাকায় সাত শতাধিক হোটেল-মোটেল-রেস্তোরাঁ ও রিসোর্ট রয়েছে। তবে জেলা প্রশাসন, মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০টির মধ্যে। প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন যাচাই করতে গিয়ে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন ধরনের ঘাটতি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিকবার সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হলেও সব ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আলোচিত টুপটুপ রিসোর্টেরও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছিল না বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এ ঘটনায় রিসোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানিয়েছেন, ২০১৩ সালের মাস্টারপ্ল্যান সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সংশোধিত মাস্টারপ্ল্যানের কাজ শেষ হলে পরিকল্পিত উন্নয়ন ও স্থাপনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টুপটুপ রিসোর্ট ছাড়াও দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এসব প্রতিষ্ঠানের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন জানিয়েছেন, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টসহ প্রায় আড়াই শ প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান।
বান্দরবানে পাঁচ শতাধিক রিসোর্ট, অনুমোদন মাত্র ৭৯টির
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এবং কক্সবাজার পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। পাহাড়, বন, লেক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছর এসব এলাকায় বিপুলসংখ্যক পর্যটক ভিড় করেন। তাঁদের আবাসন ও বিনোদনের চাহিদা ঘিরে গত এক দশকে গড়ে উঠেছে বহু হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও হাউসবোট।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এসব এলাকায় অন্তত দেড় হাজার হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও হাউসবোট রয়েছে। এর মধ্যে গত এক দশকে পাহাড়ি এলাকা ও কক্সবাজারে সাত শতাধিক ইকো রিসোর্ট গড়ে উঠেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বান্দরবান জেলা হোটেল রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় পাঁচ শতাধিক রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। এর মধ্যে জেলা প্রশাসনের অনুমোদন আছে মাত্র ৭৯টির। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন রয়েছে ৩২টির এবং ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র আছে ৬০টি হোটেল-রিসোর্টের।
অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কিংবা জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদে নামমাত্র আবেদন করে ব্যবসা শুরু করেছে। ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই কিছু প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নোটিশ ও সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও সব ক্ষেত্রে তা কার্যকর হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনিক, আইনগত ও আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ক্ষেত্রেও জটিলতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা, পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা এবং অগ্নিনিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এসব বিষয় উপেক্ষা করা হলে পর্যটন ব্যবসার প্রসারই দীর্ঘমেয়াদে প্রাকৃতিক সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনার ক্ষতির কারণ হতে পারে।
রাঙামাটিতে অগ্নিকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
রাঙামাটি পর্যটনশিল্প সমবায় সমিতির তথ্য অনুযায়ী, জেলা শহর ও আশপাশে ৬০টি হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এ ছাড়া ১০টি ইকো রিসোর্ট এবং কাপ্তাই থেকে আসামবস্তি পর্যন্ত লেকের কোলঘেঁষে আরও ১০টি ইকো রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। কাপ্তাই লেকে রয়েছে প্রায় ১৫টি হাউসবোট।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৩০টি সমিতির তালিকাভুক্ত। অনুমোদনহীন কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে জটিলতা রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সমিতির তালিকায় নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রাঙামাটিতে ২০১৭ সালের পর থেকে অন্তত পাঁচবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভয়াবহ আগুনে অন্তত ৩০টি রিসোর্ট পুড়ে যাওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্রুত পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ায় ওই ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা কম ছিল বলে জানানো হয়েছে।
পর্যটনকেন্দ্রিক স্থাপনায় আগুন লাগলে সরু সড়ক, দুর্গম পাহাড়ি পথ, কাঠের তৈরি অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত পানির উৎসের অভাব উদ্ধারকাজকে জটিল করে তুলতে পারে। তাই এসব এলাকায় রিসোর্ট পরিচালনার আগে অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা, জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
খাগড়াছড়িতে ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন করেছে মাত্র চার প্রতিষ্ঠান
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতেও আবাসিক হোটেল ও পর্যটন স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলায় ৪২টি আবাসিক হোটেল পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নবায়ন করেছে।
পর্যটকদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে শুধু হোটেল পরিচালনার অনুমতি থাকাই যথেষ্ট নয়; ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিক সংযোগ, জরুরি বহির্গমন ও কর্মীদের প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে ছোট একটি দুর্ঘটনাও বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
সুন্দরবন এলাকায় পরিবেশবান্ধব পর্যটনের নামে নিরাপত্তাঝুঁকি
বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের কোলঘেঁষে সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় পর্যটকদের জন্য রিসোর্ট ও অবকাশকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের একাংশে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, ফায়ার সেফটি প্ল্যান, জরুরি বিকল্প সিঁড়ি কিংবা প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের বৈধ ফায়ার লাইসেন্স নেই। শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জে সুন্দরবনসংলগ্ন সুশীলন রিসোর্টের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়ন করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বর্ষা রিসোর্টে সেফটি প্ল্যানের ঘাটতির কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তালা উপজেলার ত্রিশমাইল এলাকার অগ্রগতি রিসোর্ট এবং তালার উত্তরণসহ অন্যান্য অবকাশকেন্দ্রেও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্রের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন, পানির ব্যবহার এবং বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি। অপরিকল্পিত স্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন কার্যক্রম সুন্দরবনের সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কুয়াকাটায় ৩০০টির বেশি হোটেল-মোটেল
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকতকেন্দ্রিক পর্যটন এলাকা। এখানে পর্যটকদের আবাসন ও বিনোদনের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হোটেল-মোটেল ব্যবসারও বিস্তার ঘটেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুয়াকাটায় বর্তমানে ৩০০টির বেশি হোটেল-মোটেল রয়েছে, যার অধিকাংশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠানের কী ধরনের অনুমোদন নেই, তার বিস্তারিত পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পর্যটনকেন্দ্রের হোটেল-মোটেলগুলোতে নিরাপদ ভবন, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমন, পর্যাপ্ত পানি ও স্যানিটেশনব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে পর্যটকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত স্থাপনা উপকূলীয় পরিবেশ, পানি নিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
শ্রীমঙ্গলে পাহাড়-টিলা কেটে রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগ
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। চা-বাগান, পাহাড়-টিলা, বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে এখানে পর্যটন ব্যবসার দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটেছে। তবে এই সম্প্রসারণের পাশাপাশি পরিবেশ ধ্বংস ও অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপজেলার রাধানগর, বিষামনী, ডলুছড়া, দিলবরনগর, বেগুনবাড়ী ও মহাজীরাবাদ এলাকায় পাহাড়-টিলা কেটে এবং বনাঞ্চল ধ্বংস করে অর্ধশতাধিক রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব এলাকায় আরও কয়েকটি স্থাপনার নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১০০টি রিসোর্ট থাকার তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে; এর অধিকাংশের অনুমোদন ও নকশা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, পাহাড়-টিলা কেটে স্থাপনা নির্মাণ করলে ভূমিক্ষয়, পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা, ভূমিধসের ঝুঁকি এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হতে পারে। বনভূমি সংকুচিত হলে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয় এবং মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়ে।
অপরিকল্পিতভাবে রিসোর্ট নির্মাণের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এসব স্থাপনায় অনৈতিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনিক নজরদারি জোরদারের দাবি উঠেছে।
গাজীপুরে অধিকাংশ রিসোর্টে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকার কাছাকাছি সবুজে ঘেরা গাজীপুরে গত কয়েক বছরে বেসরকারি উদ্যোগে অসংখ্য রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ছুটির দিন, পারিবারিক ভ্রমণ, করপোরেট অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আয়োজনকে কেন্দ্র করে এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়ছে।
প্রতিবেদনে ট্যুরিস্ট পুলিশের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গাজীপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭৮টি রিসোর্ট রয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় পর্যায়ের তথ্যে প্রায় ১০০টি রিসোর্টের উল্লেখ রয়েছে। এই সংখ্যার পার্থক্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য সমন্বয় ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব রিসোর্টের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫টিতে মানসম্মত সুযোগ-সুবিধা ও আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থা রয়েছে। বাকি অনেক প্রতিষ্ঠানে যথাযথ ব্যবস্থাপনা, ফায়ার লাইসেন্স ও নিরাপত্তা পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া কিছু রিসোর্টে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। মাঝেমধ্যে পুলিশি অভিযান পরিচালিত হলেও নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গাজীপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, জরুরি বহির্গমন এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর স্থাপনার প্রভাবও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
সাভার-আশুলিয়ায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই এলাকায়ও হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে। এসব এলাকার অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু স্থানীয় পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সাভার ও আশপাশের এলাকায় ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া অর্ধশতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট পরিচালিত হচ্ছে।
এলাকাটির উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আশুলিয়ার জামগড়ায় ফ্যান্টাসি কিংডম কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থিত রিসোর্ট আটলান্টিস, জিরাব এলাকার বর্ণচ্ছটা রিসোর্ট ও মমতা পল্লি রিসোর্ট, দক্ষিণ গৌরীপুর এলাকার সাফায়ার হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট এবং আশুলিয়া মডেল টাউনের উত্তর দত্তপাড়ার আর্ক ক্যাসল রিসোর্ট।
এ ছাড়া সাভারের বিরুলিয়ায় ব্র্যাকের সিডিএম, সিন্দুরিয়া এলাকার ইডেন গার্ডেন রিসোর্ট, গেরুয়া রোডের পালমাইরা রিসোর্ট এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক পর্যটন ও অবকাশকেন্দ্র রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজমহল রিসোর্ট, ছায়াবীথি রিসোর্ট, জিয়ন বুটিক রিসোর্ট ও কৃষিবিদ রিসোর্টের নামও প্রতিবেদনে এসেছে।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ থাকাই সেটির অনুমোদনহীনতা বা অনিয়মের প্রমাণ নয়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হালনাগাদ নথি ও অনুমোদন যাচাই করা প্রয়োজন।
সাভার-আশুলিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পর্যটন স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিদর্শন, অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই, পরিবেশগত ছাড়পত্র পরীক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তদারকি জরুরি। শুধু ট্রেড লাইসেন্সের ভিত্তিতে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নয়—প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
কেন বিপজ্জনক হয়ে উঠছে অনুমোদনহীন রিসোর্ট?
রিসোর্ট ব্যবসায় অনুমোদনসংক্রান্ত অনিয়মের পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি পর্যটকদের জন্য বহুমাত্রিক ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি স্থাপনায় আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, কার্যকর জরুরি বহির্গমন পথ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী না থাকলে প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়ে।
অনেক পাহাড়ি ও বনাঞ্চলসংলগ্ন রিসোর্টে প্রবেশপথ সংকীর্ণ বা দুর্গম হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকারী দলের দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। পর্যটকদের অবস্থানসংক্রান্ত সঠিক হিসাব এবং জরুরি অবস্থায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা না থাকলেও উদ্ধারকাজ ব্যাহত হতে পারে।
অন্যদিকে, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ থাকলে পাহাড় কাটা, বনভূমির ক্ষতি, জলাশয় ভরাট, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহে বাধা এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য নিষ্কাশনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব কর্মকাণ্ড শুধু স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে না, দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন এলাকার আকর্ষণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশবান্ধব বা ইকো রিসোর্টের নাম ব্যবহার করলেই কোনো স্থাপনা পরিবেশবান্ধব হয়ে যায় না। এর নির্মাণপদ্ধতি, জমির ব্যবহার, পানি ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য নিষ্কাশন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত অনুমোদন—সবকিছু বিবেচনা করে প্রকৃত পরিবেশগত মান নির্ধারণ করতে হয়।
তদারকির দুর্বলতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অনুমোদনহীন স্থাপনা গড়ে ওঠার অভিযোগ প্রশাসনিক নজরদারি ও আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কোনো প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ব্যবসা পরিচালনা করলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর পরিদর্শন, নোটিশ প্রদান, ব্যবস্থা গ্রহণ ও অনুসরণের প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রিসোর্টের বৈধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জেলা পরিষদ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও তার অর্থ এই নয় যে, অন্য সব প্রযোজ্য অনুমোদনও রয়েছে। কোন ধরনের স্থাপনার জন্য কোন কোন অনুমোদন প্রয়োজন, তা স্পষ্টভাবে জানানো এবং তা নিয়মিত যাচাই করা দরকার।
প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শর্ত মেনে চলছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ
পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, নেপাল, থাইল্যান্ড এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ইকো ট্যুরিজম ও কমিউনিটি ট্যুরিজমের বিকাশ থেকে বাংলাদেশ শিক্ষা নিতে পারে। এসব পর্যটন মডেলের মূল লক্ষ্য কেবল পর্যটক আকর্ষণ নয়; স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ আবাসন এবং স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে পাহাড়, বন, সমুদ্রসৈকত, হাওর ও নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে পরিবেশগত সক্ষমতা বিবেচনায় পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তা, স্থানীয় মানুষের স্বার্থ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কী করা প্রয়োজন?
পর্যটন খাতের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—
প্রথমত, দেশের সব পর্যটন এলাকার হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও হাউসবোটের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে অনুমোদন ও লাইসেন্সের অবস্থা যাচাই করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে নিয়মিত পরিদর্শন চালাতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিটি পর্যটন স্থাপনায় প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমন পথ, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, পাহাড়, বন, জলাশয় ও সংবেদনশীল প্রতিবেশব্যবস্থার ক্ষতি করে নির্মিত স্থাপনার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। পরিবেশগত আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
পঞ্চমত, পর্যটকদের জন্য অনলাইনে যাচাইযোগ্য অনুমোদন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে ভ্রমণের আগে তাঁরা আবাসন প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে জানতে পারেন।
ষষ্ঠত, অনুমোদনহীন স্থাপনা শনাক্ত করার পাশাপাশি বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোরও নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং পরিবেশগত শর্ত পালন নিশ্চিত করতে হবে।
নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করাই এখন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের পর্যটন খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু পর্যটকদের জীবন ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রেখে কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে এই খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
কক্সবাজারের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনা এবং দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় অনুমোদনসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তাই শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি পর্যটন অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা তদারকি ও পরিবেশ সংরক্ষণের বৃহত্তর চ্যালেঞ্জকে সামনে আনে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি, নিয়মিত পরিদর্শন, স্বচ্ছ অনুমোদনব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটকদের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে পাহাড়, বন, নদী ও জলাশয় সংরক্ষণ করে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
পর্যটন ব্যবসার সম্প্রসারণের সঙ্গে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সমন্বয় ঘটানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য নির্মিত স্থাপনাগুলোই একসময় তাঁদের জীবন, প্রকৃতি ও দেশের পর্যটন সম্ভাবনার জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

