দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে নিশ্চিত হামে ১০৪ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০১ জনে।
একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৪২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সোমবারের নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজন ঢাকা বিভাগের। নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৩৪২ রোগী
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৪২ জন। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে।
বিভাগ অনুযায়ী নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা হলো—
ঢাকা: ৫৮৭ জন
চট্টগ্রাম: ২৯২ জন
সিলেট: ১৩৬ জন
বরিশাল: ১২৩ জন
খুলনা: ৭৩ জন
ময়মনসিংহ: ৬৯ জন
রাজশাহী: ৪০ জন
রংপুর: ২২ জন
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে সব বিভাগেই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।
১৫ মার্চ থেকে হাসপাতালে ভর্তি ১ লাখ ৯০ হাজারের বেশি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের হাসপাতালগুলোতে মোট ১ লাখ ৯০ হাজার ৬৬৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪২ জন।
একই সময়ে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৫১ জনে। তাঁদের মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২৩ হাজার ১৫৭ জনের।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বিপুলসংখ্যক মানুষ হাম-সংশ্লিষ্ট উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। তবে সন্দেহজনক রোগী, হাসপাতালে ভর্তি রোগী এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা পৃথক পরিমাপ। তাই এসব পরিসংখ্যানকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
নিশ্চিত হাম ও উপসর্গজনিত মৃত্যুর হিসাব
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে নিশ্চিত হামে ১০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৯৭ জন। সব মিলিয়ে দুই শ্রেণিতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ২০১।
এখানে নিশ্চিত হামে মৃত্যু এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু—দুটি আলাদা হিসাব। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যু পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত বলে প্রমাণিত হয়েছে, এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না। মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা ও পরীক্ষার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
হাম প্রতিরোধে সচেতনতা ও চিকিৎসা জরুরি
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ানো জীবাণু থেকে অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি।
হামের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া। তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই নিশ্চিতভাবে হাম হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা জরুরি।
শিশুর জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, খেতে না পারা, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা, খিঁচুনি বা অন্য কোনো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। সন্দেহজনক রোগীকে অন্য শিশুদের কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশনা অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
হাম প্রতিরোধে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিশুর টিকার তথ্য যাচাই করে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর পরিসংখ্যান জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষা, সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং টিকাদান কার্যক্রম নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে প্রকাশিত তথ্য পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে সহায়তা করছে। তবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে চিকিৎসাসেবা জোরদার করার পাশাপাশি টিকাদান, জনসচেতনতা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন।

