বাংলাদেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি উদ্বেগজনক পর্যায়ে থাকলেও এখনই দেশে ডেঙ্গুর টিকা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না সরকার। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকা ব্যবহারের পথ তৈরি হয়েছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের ৪৩টি দেশে ডেঙ্গুর টিকা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা কবে অনুমোদন পাবে এবং সাধারণ মানুষ কবে এই টিকা নেওয়ার সুযোগ পাবেন, তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ডেঙ্গু প্রতিরোধে দুটি টিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছে—ফ্রান্সের সানোফি পাস্তুরের ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ এবং জাপানের তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালসের ‘কিউডেঙ্গা’। এর মধ্যে কিউডেঙ্গা টিকা ভারতে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে কোনো দেশে টিকা ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়া এবং জাতীয় পর্যায়ে গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা এক বিষয় নয়। টিকার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, বয়সভিত্তিক উপযোগিতা, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার হার এবং দেশের রোগতাত্ত্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে কেন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা?
ডেঙ্গু বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘদিনের বড় চ্যালেঞ্জ। বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বাড়লে সংক্রমণের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। ঘনবসতিপূর্ণ নগরাঞ্চল, অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন, বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি এবং মশা নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গু প্রতিরোধ জটিল হয়ে উঠেছে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কারও কারও জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ও পেশিতে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। আবার কিছু রোগীর ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ, রক্তচাপ কমে যাওয়া, শক এবং অন্যান্য গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে গুরুতর ডেঙ্গু প্রাণঘাতীও হতে পারে।
প্রতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা, হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর ঘটনা পরিবার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। এ কারণে মশা নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও যথাযথ চিকিৎসার পাশাপাশি টিকাকে সম্ভাব্য প্রতিরোধমূলক উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে ডেঙ্গুর টিকা এলেই সংক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। টিকা ব্যবহারের পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃত দুটি টিকা
ডেঙ্গু প্রতিরোধে আলোচিত দুটি টিকা হলো ডেংভ্যাক্সিয়া ও কিউডেঙ্গা। তবে এই দুই টিকার ব্যবহারবিধি, বয়সসীমা, পূর্ববর্তী ডেঙ্গু সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্ক এবং অনুমোদনের শর্ত এক নয়।
ডেংভ্যাক্সিয়া: ফ্রান্সের সানোফি পাস্তুরের তৈরি এই টিকার ব্যবহার নির্দিষ্ট শর্তের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে টিকা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস বা পরীক্ষার মাধ্যমে পূর্ববর্তী সংক্রমণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যেসব ব্যক্তির আগে ডেঙ্গু হয়নি, তাঁদের ক্ষেত্রে এই টিকা ব্যবহারে ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। তাই এটি নির্বিচারে সবার জন্য প্রয়োগযোগ্য নয়।
কিউডেঙ্গা: জাপানের তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালসের তৈরি এই টিকাটি ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরির উদ্দেশ্যে তৈরি। তবে বয়স, ডোজ, ব্যবহারের অনুমোদন এবং অন্যান্য শর্ত সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে।
কোনো টিকাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তা সব দেশে একইভাবে প্রয়োগ করতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই। প্রতিটি দেশকে নিজস্ব রোগতাত্ত্বিক পরিস্থিতি, জনস্বাস্থ্যগত প্রয়োজন, টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর অ্যান্টিবডি নিয়ে কী বলছে গবেষণা?
ডেঙ্গুর টিকাদান কর্মসূচি চালুর ক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগে ডেঙ্গু সংক্রমণের হার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। কারণ কিছু ডেঙ্গু টিকার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা ব্যক্তির পূর্ববর্তী সংক্রমণের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রদত্ত তথ্যে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) বরাতে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুর অ্যান্টিবডি প্রাপ্তির হার ২৪ শতাংশ থেকে ৯৩ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অঞ্চলভেদে এই ব্যবধান যথেষ্ট বড়।
এ ধরনের তথ্য ডেঙ্গুর বিস্তার ও টিকাদানের সম্ভাব্য উপযোগিতা মূল্যায়নে সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো একটি এলাকায় অ্যান্টিবডির হার বেশি পাওয়া মানেই পুরো দেশের জনগোষ্ঠী জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির জন্য উপযুক্ত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। নমুনার আকার, গবেষণার পদ্ধতি, বয়সভিত্তিক ফলাফল, অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ধরন এবং গবেষণার প্রতিনিধিত্বশীলতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, টিকাদানের সিদ্ধান্তে স্থানীয় ডেঙ্গু সংক্রমণের হার, টিকার উপযোগী জনগোষ্ঠী এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেশব্যাপী নির্ভরযোগ্য তথ্য বিশ্লেষণ করে টিকাদানের উপযুক্ত এলাকা ও জনগোষ্ঠী নির্ধারণ করা জরুরি।
ব্যক্তিপর্যায়ে টিকা দেওয়ার সুযোগ চান বিশেষজ্ঞ
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক সাইফুল্লাহ মুন্সীর মতে, বাংলাদেশ ডেঙ্গুর টিকাদান কর্মসূচির জন্য বেশ উপযোগী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারিভাবে এখনই গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু করা সম্ভব না হলেও ব্যক্তিপর্যায়ে সাধারণ মানুষের জন্য টিকা পাওয়ার সুযোগ সহজ ও উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের এ ধরনের মতামতের পেছনে রয়েছে ডেঙ্গুর পুনঃসংক্রমণ ও গুরুতর রোগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ। ডেঙ্গু ভাইরাসের একাধিক সেরোটাইপ রয়েছে। এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ কারণে টিকার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ব্যক্তিপর্যায়ে টিকা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হলেও সংশ্লিষ্ট টিকার বাংলাদেশে নিবন্ধন বা অনুমোদন, নির্ধারিত বয়সসীমা, উপযুক্ত ব্যক্তিকে নির্বাচন, পূর্ববর্তী সংক্রমণের তথ্য, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন। টিকা নেওয়ার আগ্রহ থাকলেও অনুমোদন ও চিকিৎসাগত নির্দেশনা ছাড়া নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
সরকারের অবস্থান: এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়
ডেঙ্গুর টিকা অনুমোদনের বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত জানিয়েছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ ও মৃত্যুহার কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে টিকা নিয়ে ভাবছে সরকার। তবে বর্তমানে হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর ডেঙ্গুর টিকা অনুমোদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সরকারের এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে আলোচনা থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি চালুর সিদ্ধান্ত হয়নি। টিকা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, জনস্বাস্থ্যগত প্রয়োজন, টিকার নিরাপত্তা এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসছে—বাংলাদেশে কোন বয়সের মানুষ টিকার জন্য উপযুক্ত হবেন, কোন অঞ্চলে আগে টিকাদান শুরু করা যেতে পারে, টিকার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকা সরবরাহের আর্থিক ও লজিস্টিক সক্ষমতা কতটুকু রয়েছে।
এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর, ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
টিকা এলেও মশা নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই
ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বাড়লেও মশা নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব কমছে না। বাড়ি, ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন ভবন, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র এবং অন্যান্য স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই নিয়মিত এসব স্থান পরিষ্কার রাখা এবং পানি জমতে না দেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা প্রয়োজন। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে নিজে থেকে ওষুধ গ্রহণের পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্থিরতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ, রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং উপযুক্ত জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ টিকাদান—এই পদক্ষেপগুলোর সমন্বয় ডেঙ্গু মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা কবে আসবে?
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। সরকার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বললেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আরও মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে।
দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি বিবেচনায় টিকা নিয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অযথা বিলম্ব না করার দাবি উঠছে। অন্যদিকে, টিকা ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং উপযুক্ত জনগোষ্ঠী নির্ধারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে আলোচনা এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। তবে টিকা অনুমোদন ও প্রয়োগের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত মশা নিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং যথাযথ চিকিৎসাই ডেঙ্গু মোকাবিলার প্রধান ভরসা।

