ঢাকা মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

menu

ডেঙ্গুতে এক দিনে ১১ মৃত্যু, চলতি বছরে প্রাণহানি ৪০০ ছাড়াল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম

ডেঙ্গুতে এক দিনে ১১ মৃত্যু, চলতি বছরে প্রাণহানি ৪০০ ছাড়াল

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৭১ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০ জনে। আর জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ২৮ হাজার ২৩৭ জন।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ১১ জনের মৃত্যু চলতি বছরের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা। এর আগে গত ৬ ও ১৫ অক্টোবর এক দিনে সর্বোচ্চ ১০ জন করে মারা গিয়েছিলেন। নতুন এই পরিসংখ্যান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

অক্টোবরেই ডেঙ্গুতে ১৫৫ জনের মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম দিকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও জুন থেকে পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ডেঙ্গুতে দুজন করে মারা যান। মার্চ ও এপ্রিলে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। মে মাসে মারা যান একজন। এরপর জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়।

সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান ১৪৮ জন। আর অক্টোবরের প্রথম ২৭ দিনেই মারা গেছেন ১৫৫ জন। অর্থাৎ, শুধু সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেই ডেঙ্গুতে ৩০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরের মোট মৃত্যুর ৭৫ শতাংশের বেশি।

এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বছরের শেষভাগে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে অক্টোবরের ২৭ দিনেই আগের মাসের পুরো সময়ের তুলনায় বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি ২ হাজার ৭১ জন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২ হাজার ৭১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৯৯ জন। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ২৫০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৪১ জন, রাজশাহী বিভাগে ২২৯ জন, বরিশাল বিভাগে ২১৭ জন, রংপুর বিভাগে ১১২ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৭ জন এবং সিলেট বিভাগে ২৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যায় ঢাকা বিভাগ শীর্ষে থাকলেও অন্যান্য বিভাগেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। বিশেষ করে খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে দুই শতাধিক করে রোগী ভর্তির তথ্য পাওয়া গেছে।

খুলনা ও ঢাকায় প্রাণহানি বেশি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১১ জনের মধ্যে ঢাকায় তিনজন, খুলনায় তিনজন, বাগেরহাটে তিনজন, চট্টগ্রামে একজন এবং নওগাঁয় একজন রয়েছেন।

বিভাগভিত্তিক প্রতিবেদনে ঢাকা বিভাগে তিনজন, খুলনা বিভাগে ছয়জন, চট্টগ্রাম বিভাগে একজন এবং রাজশাহী বিভাগে একজনের মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জেলাভিত্তিক ও বিভাগভিত্তিক মৃত্যুর হিসাব প্রকাশের আগে মূল বুলেটিনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর এই চিত্র বলছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নজরদারি, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা প্রস্তুত রাখা জরুরি।

চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি ১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ২৩৭ জন। তাঁদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৪২২ জন।

প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৬ হাজার ৪১৫ জন ডেঙ্গু রোগী।

বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসাসেবা, শয্যা ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতির আশঙ্কা থাকায় জ্বরের শুরু থেকেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে চিকিৎসকেরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

গত বছরের তুলনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু বেড়েছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৬৬ হাজার ৪২৩ জন। ওই সময়ে মারা গিয়েছিলেন ২৬৯ জন।

অন্যদিকে, চলতি বছরের একই সময় পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৮ হাজার ২৩৭ এবং মৃতের সংখ্যা ৪০০। অর্থাৎ, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এই তুলনা ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দিলেও বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে আক্রান্তের সংজ্ঞা, তথ্য সংগ্রহের সময়সীমা এবং প্রতিবেদন প্রকাশের পদ্ধতি একই কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব

ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, বারান্দা এবং আশপাশের স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, পানির পাত্র ও অন্যান্য সামগ্রীতে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে মশারি ব্যবহার, শরীর ঢাকা পোশাক পরা এবং মশা নিরোধক ব্যবহারের মতো সতর্কতাও জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

জ্বর হলে অবহেলা নয়, চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি

ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা, বয়স ও অন্যান্য অসুস্থতা বিবেচনায় চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। জ্বর কমে গেলেই রোগের ঝুঁকি শেষ হয়ে গেছে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়; কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এ সময়ের পরও জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

চলতি বছর ডেঙ্গুতে ৪০০ জনের মৃত্যু এবং ১ লাখ ২৮ হাজারের বেশি রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে প্রাণহানি বেড়ে যাওয়ায় রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসাসেবা এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি নাগরিকদেরও নিজ নিজ বাসা ও কর্মস্থলের আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। একই সঙ্গে জ্বরের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং বিপৎসংকেত দেখা দিলে দেরি না করাই হতে পারে প্রাণহানি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!