দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৯৪৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩১ জনে। আর বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ জন।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এ সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ হাজার ৮৩০ জন। সব মিলিয়ে চলতি বছরে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৩১ জন।
অক্টোবরের প্রথম ১৪ দিনেই ৮৬ জনের মৃত্যু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথম ১৪ দিনেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। মাসের শুরু থেকেই প্রাণঘাতী এ রোগে মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মাসভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগস্টে মারা গেছেন ৪৩ জন এবং জুলাইয়ে ৩৬ জন। এ ছাড়া জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের প্রথম ১৪ দিনের ৮৬ জনসহ মাসভিত্তিক উল্লেখিত মৃত্যুর সংখ্যা যোগ করলে চলতি বছরের মোট মৃত্যুর হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য পাওয়া যায়।
এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি প্রায় দুই হাজার রোগী
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে বলা হয়েছে, বুধবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৯৪৩ জন ভর্তি হয়েছেন। নতুন রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই সময়ে ১ হাজার ৮৩০ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। তবে নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছাড়পত্র পাওয়া রোগীর সংখ্যার চেয়ে বেশি থাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর মোট সংখ্যা বেড়েছে কি না, তা নির্ধারণে আগের দিনের ভর্তি ও ছাড়পত্রের হিসাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
চলতি বছর এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ জনে। তাঁদের মধ্যে ১ লাখ ১ হাজার ৩১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। অর্থাৎ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ভর্তি রোগীদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন। তবে কিছু রোগী এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস জরুরি
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, নির্মাণাধীন ভবন এবং আশপাশের এলাকায় জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
এ কারণে বাসাবাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, পানির ট্যাংক, ড্রাম ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন। কোথাও পানি জমে থাকলে তা অপসারণের পাশাপাশি পানির পাত্র ঢেকে রাখা এবং আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। জ্বরের সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতায় ভোগা রোগীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসাব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ ডেঙ্গুর বিস্তার ও প্রাণহানি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু ৩৩১ জনে পৌঁছেছে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার। এ পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত সতর্কতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।

