ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

menu

ডেঙ্গু রোধে পাড়া-মহল্লায় মাইকিং, জুমার খুতবায় সচেতনতার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ০৫:৫২ পিএম

ডেঙ্গু রোধে পাড়া-মহল্লায় মাইকিং, জুমার খুতবায় সচেতনতার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ ও জনসচেতনতা বাড়াতে পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত মাইকিং এবং জুমার নামাজের খুতবায় সচেতনতামূলক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দেন।

সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

পাড়া-মহল্লায় মাইকিং, জুমার খুতবায় সচেতনতার বার্তা

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; এ জন্য নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে এবং নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে।

এ লক্ষ্যে পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত মাইকিংয়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার নির্দেশনা দেন তিনি। পাশাপাশি জুমার নামাজের খুতবায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং বাড়িঘর পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সচেতনতামূলক বক্তব্য দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।

স্থানীয় পর্যায়ে মাইকিংয়ের মাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছানো হলে বিভিন্ন বয়সী মানুষের কাছে ডেঙ্গু প্রতিরোধের তথ্য সহজে পৌঁছানো সম্ভব। একইভাবে মসজিদকেন্দ্রিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ধর্মীয় সমাবেশে উপস্থিত মানুষের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা যেতে পারে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে এসব প্রচার কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিকদের নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ দূর করার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ

সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আগামী কয়েক মাসের কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যেসব এলাকায় মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, সেসব এলাকায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এলাকাভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার করা হলে আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ পরিচালনা করা সহজ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করা, জমে থাকা পানি অপসারণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন এবং অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই এসব স্থান নিয়মিত পরীক্ষা করে জমে থাকা পানি অপসারণ করা এবং পানির পাত্র পরিষ্কার রাখা জরুরি।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু মশা নিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত এবং নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সরকারি আবাসিক কোয়ার্টার ও হাসপাতাল পরিষ্কার রাখার সিদ্ধান্ত

ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সরকারি আবাসিক কোয়ার্টার ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়েও সভায় সিদ্ধান্ত হয়।

সরকারি আবাসিক এলাকায় পানি জমে থাকা, অব্যবহৃত পাত্র, পরিত্যক্ত সামগ্রী কিংবা অপরিচ্ছন্ন স্থান এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। একইভাবে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা এবং মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সুরক্ষায়ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামগ্রিক উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব

সভায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য বিভাগ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ও রোগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনায় ভূমিকা রাখে।

এসব কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় থাকলে আক্রান্তের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো চিহ্নিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল ও সরঞ্জাম ব্যবহার এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সহজ হয়।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রেখে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের উদ্যোগ আরও জোরদার করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের করণীয়

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনতা ও অংশগ্রহণ জরুরি। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযোগী স্থান ধ্বংস করার মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

এ জন্য—

বাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকতে না দেওয়া।
ফুলের টব, পানির পাত্র ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়মিত পরিষ্কার করা।
পরিত্যক্ত টায়ার, বোতল, কৌটা ও প্লাস্টিকের পাত্র অপসারণ করা।
পানির ট্যাংক ও সংরক্ষণপাত্র ঢেকে রাখা।
দিনের বেলায়ও মশার কামড় থেকে বাঁচতে উপযুক্ত পোশাক ও মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা।
জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।

বিশেষ করে এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে। তাই শুধু রাতে মশারি ব্যবহার নয়, দিনের বেলাতেও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকার ব্যবস্থা করা জরুরি।

সভায় উপস্থিত ছিলেন যারা

ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

সভায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এলাকাভিত্তিক কার্যক্রম জোরদার, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সমন্বিত উদ্যোগেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রত্যাশা

ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা, নিয়মিত তদারকি এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। পাড়া-মহল্লায় মাইকিং, মসজিদে সচেতনতামূলক বক্তব্য, সরকারি আবাসিক এলাকা ও হাসপাতাল পরিষ্কার রাখা এবং ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় বিশেষ উদ্যোগ—এসব কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হলে প্রতিরোধ প্রচেষ্টা আরও কার্যকর হতে পারে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, আক্রান্ত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং নাগরিকদের সচেতনতা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। সরকারি সংস্থার পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে সম্মিলিত উদ্যোগ আরও শক্তিশালী হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!