পোশাকশ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানোর বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রোববার (২ নভেম্বর) রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনাসংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। মজুরি বোর্ডকে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি শ্রম মন্ত্রণালয়কে শ্রমিকদের অধিকার ও আর্থিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেছেন তিনি।
শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে গঠন করা হয়েছে বোর্ড
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য প্রতি তিন বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠনের বিধান রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে সময় থাকলেও সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আগেই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি জানান, মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম জমা দিলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে প্রতিনিধির নাম পেতে কিছুটা বিলম্ব হয়। শনিবার রাতে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির নাম পাওয়ার পর রোববার সকালে মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মজুরি বোর্ডে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান, পরিবার নিয়ে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকা এবং আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করবেন।
সহিংস আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে সহিংস আন্দোলনের কোনো প্রয়োজন ছিল না। আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি ও স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।
তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, বিভিন্ন স্থানে হামলা, যানবাহন ভাঙচুর এবং কারখানায় অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যারা সহিংসতায় জড়িত হবে, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করবে কিংবা অযথা বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সীমান্তের ওপার থেকে উসকানির অভিযোগ সরকারের
সাম্প্রতিক আন্দোলনে মুখোশধারীদের অনুপ্রবেশ ও উসকানির বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের কাছে থাকা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিরীহ পোশাকশ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে কেউ কেউ ইন্ধন জোগাচ্ছে।
তাঁর দাবি, এর মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, রপ্তানি বাণিজ্য ব্যাহত এবং পোশাকশিল্পের উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের অপতৎপরতা সরকার কঠোরভাবে মোকাবিলা করবে। সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির যেকোনো চেষ্টা পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোরভাবে দমন করবে।
বন্ধ কারখানা চালুর আহ্বান
আন্দোলনের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া পোশাক কারখানাগুলো চালুর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো কারণে কারখানা বন্ধ হয়ে থাকলে তা যেন সাময়িক হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিকদের পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে হবে। রপ্তানির জন্য পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও অগ্রগতি বজায় রাখা। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে কাজ করা।
পোশাকশিল্পের বিকাশে জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা তুলে ধরলেন মন্ত্রী
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান রয়েছে। সরকার এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে চায়। রপ্তানি খাত সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নও সরকারের লক্ষ্য।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যারা
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং বিএনপির শ্রমিক সংগঠক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে, পোশাকশ্রমিকদের মজুরি ও জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগের পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। মজুরি বোর্ডের আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ এবং শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

